অসহায় প্রাণী থেকে মানুষ, সবার পাশেই বাচ্চু

কোথাও হয়তো জালে আটকা পড়েছে পাখি কিংবা পথ ভুলে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে সাপ। হয়তো খালে এসে আটকে গেছে ডলফিন কিংবা সমুদ্রসৈকতে পড়ে আছে অসুস্থ কচ্ছপ। খবরটি শুধু কে এম বাচ্চুর কাছে পৌঁছতে হবে। এরপর তিনি ছুটে যাবেন বিপদে পড়া এসব প্রাণীর কাছে। কখনো সৈকতে ভেসে আসা মৃত ডলফিন বা তিমিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন, কখনো অসুস্থ প্রাণীকে নিজের কাছে রেখে চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর ফিরিয়ে দেবেন তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে। অবশ্য শুধু বন্যপ্রাণী নয়, অসহায় মানুষ ও বিপদে পড়া পর্যটকদের পাশেও তিনি দাঁড়ান একই আন্তরিকতায়।
কে এম বাচ্চু পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের নবীনপুর গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী আর দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। তার মূল পেশা পর্যটন ব্যবসা, সমুদ্রে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য রয়েছে ট্যুরিস্ট বোট। তবে ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি প্রকৃতি, পরিবেশ, বন্যপ্রাণী ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের এক অনন্য পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি।
২০১৬ সাল থেকে পর্যটন ব্যবসার পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং অসহায় ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের সহায়তায় কাজ করে আসছেন বাচ্চু। দীর্ঘ প্রায় এক দশকের পথচলায় তার উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আহত কিংবা বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া কয়েক হাজার বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। উদ্ধার করা এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে শিয়াল, বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, শালিক, ঘুঘু, বক, টিয়া, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, কচ্ছপ, ডলফিন ও তিমি। পাশাপাশি কচ্ছপের ডিম ও বাচ্চা সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পরিবেশে অবমুক্ত করার কাজেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
ধানক্ষেতে পেতে রাখা জালে পাখি আটকা পড়লে সেগুলোকেও উদ্ধার করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যা করেন বাচ্চু। সুস্থ হলে সেগুলোকে ছেড়ে দেন মুক্ত আকাশে। লোকালয়ে সাপ আটকে পড়লে সেটিকে না মেরে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করেন। কোনো শিয়াল, বনবিড়াল বা অন্য বন্যপ্রাণী মানুষ ধরে ফেললেও সেটি উদ্ধারের উদ্যোগ নেন তিনি।
সমুদ্রের প্রাণীদের নিয়েও রয়েছে তার নিয়মিত তৎপরতা। সৈকতে অসুস্থ বা বিপদে পড়া কচ্ছপ পাওয়া গেলে নিজের কাছে রেখে প্রয়োজনীয় খাবার ও পরিচর্যা করেন। সুস্থ হলে ফিরিয়ে দেন সমুদ্রে। নদী কিংবা খালে ডলফিন বা শুশুক আটকে পড়ার খবর পেলে উদ্ধার করে নিরাপদে সাগরে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা মৃত ডলফিন কিংবা তিমি নিরাপদ স্থানে নিয়ে মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি এসব প্রাণী সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা দূর করতেও কাজ করেন বাচ্চু। সাপ, শিয়াল, বনবিড়াল, ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রাণীকে ভয় বা ভুল ধারণা থেকে হত্যা না করার জন্য স্থানীয়দের বোঝান। তার মতে, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায়ও নিজের উদ্যোগে একাধিকবার কুয়াকাটার বিভিন্ন দূষিত খাল পরিষ্কারের অভিযান চালিয়েছেন বাচ্চু। ময়লা-আবর্জনা অপসারণের পাশাপাশি স্থানীয়দের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং জলাশয় রক্ষায় সচেতন করার চেষ্টা করেছেন।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেছেন, ‘বাচ্চুর মতো একজন মানুষ নিজের উদ্যোগে অসহায় প্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও অবমুক্ত করার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ সমাজের অন্যদেরও উৎসাহিত করবে।’



