নুসরাত হত্যা: সিরাজ ও শাহাদাতের মৃত্যুদণ্ড বহাল

ফেনীর নিহত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। সংগৃহীত ছবি
আপিলেও মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পারলেন না মাদ্রাসা শিক্ষক সিরাজ উদদৌলা; শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে তাকে দেওয়া বিচারিক আদালতের রায়ই বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত। তার পাশাপাশি একই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ডও থাকছে বহাল।
সাত বছর আগের আলোচিত এই মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে আজ সোমবার এ রায় দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত তার প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলার পর তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশে এই হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শাহাদাতই করেছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়।
দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও বাকি ১৪ আসামির সাজা কমেছে হাই কোর্টের রায়ে। তাদের মধ্যে চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১০ জন।
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অধিকাংশ আসামিকে খালাস দেওয়া নিয়ে হাইকোর্ট বলেছে, বিচারিক আদালত এই মামলার আসামিদের নির্বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ এই মামলায় ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।
বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য আসে হাইকোর্টে, পাশাপাশি আসামিরা আপিল করেছিলেন।
ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।
নুসরাত হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। মোট ১৭ কার্যদিবসে ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষ হয় গত ২০ আগস্ট। সেদিনই আদালত রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির। আসামি পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
এখন কার কী সাজা
বিচারিক আদালতের রায়ে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও হাইকোর্টের রায়ে শুধু সিরাজ উদদৌলা, শাহাদাত হোসেন শামীমের আগের সাজাই থাকছে।
হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চারজন হলেন ওই মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ।
খালাসপ্রাপ্তরা হলেন— সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ থাকছে। আপিল বিভাগও সিরাজ উদদৌলা, শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। তা প্রত্যাখ্যাত হলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
যে বিচারক ১৬ আসামির ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন, ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সেই বিচারক মামুনুর রশিদকে ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্ট বলেছেন, বিচারিক আদালত যেভাবে নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তাতে প্রতিটি পরিবারের ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছে।
এ কারণে ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলায় হত্যা
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন তার মা শিরিন। গ্রেপ্তারও হন অধ্যক্ষ। তবে অনুসারীরা তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে বিক্ষোভ করেন।
এরপর ৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজের সঙ্গে দেখা করার পর ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। যার মূলে ছিলেন শাহাদাত হোসেন শামীম। হাইকোর্টের রায়ে যে দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তাদের একজন তিনি।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম। কারাবন্দি আসামি সিরাজ-উদ-দৌলা নুসরাতকে ভয়ভীতি দেখানো ও প্রয়োজনে পুড়িয়ে হত্যা এবং হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন শামীমকে।
সেই নির্দেশ অনুযায়ী, ৪, ৫ ও ৬ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন শামীম। এরমধ্যে ছিল—ভূঁইয়া বাজার থেকে এক লিটার কেরোসিন তেল কিনে নিজের কাছে রাখা, তিনটি বোরকা ও চার জোড়া হাতমোজা সংগ্রহ করা থেকে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত।
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ৬ এপ্রিল নুসরাত পরীক্ষা দিতে এলে পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্বে অবস্থান করা শামীম তার পেছনে পেছনে ছাদে যান। সেখানে নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিয়ে কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলেন তিনি। নুসরাত স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষিপ্ত হন শামীম। পরে নিজের বাম হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরেন এবং ডান হাত দিয়ে তার হাত পিছন দিকে নিয়ে আসেন। এরপর নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
৬ আহত নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে তাকে অগ্নিদগ্ধ করার ঘটনাটি একইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এদিকে, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারাদেশে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে সর্বস্তরের মানুষ। পরে চার্জশিট জমার ৫ মাস পর ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ মামলার ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।





