নুসরাত হত্যা: ১৬ আসামির ১০ জনই খালাস যে কারণে

ফেনীর নিহত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি— সংগৃহীত ছবি
ফেনীর নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ-বিক্ষোভ হচ্ছিল, তারমধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ে ১৬ আসামির সবাইকেই দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।
সাত বছর আগের এই মামলায় আজ সোমবার উচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছে, তাতে কেবল দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকছে। চারজনের সাজা কমে হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১০ জন খালাস পেয়ে এই মামলার দায় থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন।
ফেনীর বিচারক এই মামলায় নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, এমন কথা বলা হয়েছে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে। তদন্তের ত্রুটিপূর্ণ কিছু দিক বিচারক উপেক্ষা করেছেন, সেটাও বলেছে উচ্চ আদালত।
আসামি পক্ষের এক আইনজীবী বলেছেন, আলোচিত এই মামলায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হয়েছে। অর্থাৎ বিচারক পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে দিয়েছিলেন এমন রায়।
নুসরাত ছিলেন ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তিনি যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে।
এই অভিযোগে নুসরাতের মা মামলা করার পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সিরাজ উদদৌলা। তখন তার নির্দেশে তার অনুসারী কয়েকজন শিক্ষার্থী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা করেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
২০১৯ সালের এপ্রিলে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন নারী সংগঠন, রাজনৈতিক দলও প্রতিবাদে নেমেছিল।
নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের করা মামলায় ছয় মাসের মধ্যে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশীদ ১৬ আসামির ফাঁসির রায় দেন।
সেই মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের আপিল হলে তার শুনানি নিয়ে আজ রায় দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
এই রায়ে অধিকাংশ আসামির খালাস পাওয়া নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ওই ১০ আসামির বিরুদ্ধে হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে সরাসরি যুক্ত থাকার তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেননি প্রসিকিউশন পক্ষ। এ কারণে খালাস পেয়েছেন তারা।
হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেয়েছেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
‘নির্বিচারে ফাঁসির রায়’
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অধিকাংশ আসামিকে খালাস দেওয়া নিয়ে হাইকোর্ট বলেছে, বিচারিক আদালত এই মামলার আসামিদের নির্বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাবাদিকদের বলছিলেন, ‘নিম্ন আদালতে ১৬ জন আসামিকে নির্বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে তাদের সবার জড়িত থাকার কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেনি প্রসিকিউশন।’
মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অভিযোগপত্রে বলেছিল, ঘটনার দিন ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে পাশের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে গায়ে আগুন দেওয়া হয়। চারদিন পর ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু ঘটে।
শিশির মনির বলেন, ‘ভিক্টিম সাইক্লোন শেল্টারের তিন তলা ভবনের ছাদে ওঠে কীভাবে অগ্নিদগ্ধ হলেন, তার কোনো প্রমাণ নেই। ভিক্টিম তার মৃত্যুর আগে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, সেখানে চারজন বোরকা পরা নারীর কথা জানিয়েছিলেন। অথচ ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ১৬ জনকে, যাদের মধ্যে ১৪ জন পুরুষ।’
সাক্ষীদের বক্তব্যে অসংগতি
মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য গরমিল ও বৈপরীত্য পাওয়ার কথা তোলেন শিশির মনির।
‘মামলার চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে, আসামি কামরুন নাহার মনি বোরকাগুলো কিনে এনেছিলেন। যে দোকান থেকে বোরকাগুলো কেনার কথা বলা হয়েছে, চার্জশিটে সেই দোকানের বিক্রেতাকেও সাক্ষী করা হয়েছিল মামলায়। কিন্তু তিনি আসামি কামরুন নাহার মনিকে চেনেন না বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ফলে তিনি খালাস পেয়েছেন,’ বলেন তিনি।
তদন্তের ত্রুটি উপেক্ষিত বিচারে
হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারে তদন্তের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক উপেক্ষিত হয়েছিল। তড়িঘড়ি বা ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের কারণে অনেকের নাম সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই আসামির তালিকায় এসেছে।
এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলছিলেন, ‘দেশের ফৌজদারি মামলার বিচার ব্যবস্থায় ১৬৪ ধারায় যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়, এটা ন্যায়বিচারের পক্ষে বড় বাধা। এই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার প্রবণতা থেকে আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে বেরিয়ে আসতে হবে। আজ হাইকোর্টের রায়েও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।’
`মিডিয়া ট্রায়াল'
ঘটনাটি ব্যাপক আলোচিত হওয়ার কারণে নিম্ন আদালতে বিচার প্রভাবিত হয়েছিল বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট তাজুল।
তার কথা, ‘মিডিয়ায় অতিপ্রচারের কারণে নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করেছি, কিছু মামলায় ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের রায় যে বিচারকরা দেন তাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত জ্ঞান ও সাজা প্রদান নিয়ে আজ হাইকোর্ট আলোকপাত করেছেন। আমরা মনে করি, এ বিষয়ে ইনস্টিটিউশনাল গাইডলাইন থাকা উচিত।’
বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। আজ তাকে ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
নির্দেশে বলা হয়েছে, ‘বিচারিক আদালত যেভাবে নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তাতে প্রতিটি পরিবারের ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছে।’ এ কারণে ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া দিয়েছেন হাইকোর্ট।








