যে মানুষ নদীর
যে মানুষ বৃক্ষের

নিজ বাড়ির আঙিনায় কচি। পেছনে বাসক, পাতাবাহার আর ঔষধি গাছের সমাহার। ছবি: লেখক
পাঁচ দশক ধরে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত মানিকগঞ্জের ইকবাল হোসেন কচি। এই মানুষটির কাছে প্রকৃতি রক্ষা কোনো আলাদা কাজ নয়; মানুষের জীবন রক্ষারই আরেক নাম। তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন সোহেল হোসেন
সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাড়ির গাছগুলোর কাছে যান। তাদের শুশ্রূষা করেন। বয়সের ভারে হাঁটাচলায় আগের গতি নেই। কোনো নদী দখল কিংবা খাল ভরাট হচ্ছে শুনলে আগের মতো ছুটে যেতে না পারলেও প্রকৃতির খবর নেওয়ার অভ্যাসটা এখনো যায়নি।
শুরুটা প্রায় পাঁচ দশক আগে— ১৯৭৭ সালে। তখন তিনি তরুণ। তারও আগে কেটেছে চট্টগ্রামে। বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির সুবাদে সেখানেই শৈশব, বাল্যকাল এবং স্কুল-কলেজের দিনগুলো। ১৯৭৫ সালে বাবার মৃত্যু তার জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। পরের বছর পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন মানিকগঞ্জ।
মানিকগঞ্জে এসে নতুন এক পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় হলো তার। ১৯৭৭ সালে জড়িয়ে পড়লেন বাম রাজনীতির সঙ্গে। রাজনীতি করতে গিয়ে মানুষের কাছে গেলেন, সমাজকে একটু অন্য চোখে দেখতে শিখলেন। সেই পথে হেঁটেই জড়িয়ে গেলেন পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে।
দীর্ঘদিনের পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ইকবাল হোসেন কচি। কথা বলতে শুরু করলে প্রথমেই যা বলেন, সেটি শুনে একটু চমকে যেতে হয়।
‘আমাদের সমাজে কিছু সচেতন বেকার মানুষ থাকা দরকার।’ কিন্তু কেন বললেন এ কথা?
আসলে কথাটির ভেতরে অন্য অর্থ আছে। তিনি কর্মহীন থাকার কথা বলেন না; বলেন নিজের সময়ের অনেকটা সমাজের জন্য উৎসর্গ করার কথা।
মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী ভবনে একটি মতবিনিময় সভা থেকে যাত্রা শুরু করে ‘ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলন’। এই আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন কচি
‘আপনি বেকার না থাকলে কখনোই অন্য বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারবেন না। সমাজ ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে হলে সচেতন কিছু মানুষকে সময় দিতে হবে। আপনার হাতে যদি সময়ই না থাকে, তাহলে পরিবেশের ভেতরে যাবেন কীভাবে?’
নিজের জীবনটাই যেন উদাহরণ। চাকরি বা ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততার বাইরে তিনি সময় দিয়েছেন মানুষের জন্য। কোথাও সামাজিক আন্দোলন হচ্ছে শুনলে ছুটে গেছেন। কোনো সংগঠন পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে জানলে পাশে দাঁড়িয়েছেন। নদী, খাল, জলাশয়, বৃক্ষ, নিরাপদ পানি— একেকটি বিষয় একেক সময় ভাবনার কেন্দ্রে এসেছে।
নাগরিক সমাজের কাছ থেকে সংবর্ধনা পেয়েছেন। কিন্তু এসব তার লক্ষ্য ছিল না।
ইকবাল হোসেন কচির পরিবেশ ভাবনার শিকড় অবশ্যই রাজনীতির ভেতরে। তার কাছে রাজনীতি মানে শুধু মিছিল-মিটিং নয়; রাজনীতি মানে মানুষকে বোঝা। সমাজকে বোঝা। আর সমাজকে বুঝতে গেলে প্রকৃতিকে বাদ দেওয়া যায় না। প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখতে গিয়ে গাছের প্রতিও তার আলাদা টান তৈরি হয়। তার বাড়িতে বাসক গাছ আছে। প্রতিবেশীর কারও বাসক পাতার প্রয়োজন হলে তার বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। আছে ডিনার প্লেট অ্যারালিয়া বা বাটিপাতা। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষ মনে করেন, এই পাতার ঔষধি গুণাগুণ আছে। তুলসীগাছের কথাও বলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেক বাড়িতে এই গাছের উপস্থিতি তার চোখে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের পুরনো সম্পর্কেরই একটি উদাহরণ। বলেন পাথরকুচি, থানকুনির কথাও। প্রকৃতির ভেতর ছড়িয়ে থাকা এসব গাছ মানুষের নানা প্রয়োজন মেটায়।
তার কাছে গাছ শুধু অক্সিজেনের উৎস নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির দীর্ঘ সম্পর্কেরও একটি অংশ। এটি তিনি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখেছেন নদীর কাছে। নদী তার কাছে শুধু এক টুকরো জলধারা নয়; একটি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জনপদের জীবন, জীবিকা, কৃষি, মাছ, নৌপথ এবং মানুষের স্মৃতি। সমাজের মানুষ হিসেবে সেই নদীকে রক্ষা করাকে তিনি দায়িত্ব মনে করেন।
মানিকগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী সেই দায়িত্ববোধেরই একটি দীর্ঘ অধ্যায়। ধলেশ্বরীকে বাঁচানোর আন্দোলনের দিনগুলোর কথা উঠতেই ইকবাল হোসেন কচির কণ্ঠে ফিরে আসে পুরনো সময়ের উত্তাপ। একসময় যমুনা থেকে প্রবাহিত এই নদীর তিল্লী মুখ বন্ধ হয়ে পানি কমতে থাকে। শিল্পকারখানা ও নানা অবৈধ স্থাপনার চাপে নদী ক্রমে হারাতে থাকে তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব। ২০১৩ সালের ২৮ আগস্ট মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী ভবনে একটি মতবিনিময় সভা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলন’। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন কচি। ‘আমাদের মূল কথা ছিল— নদীটাকে বাঁচাতে হবে। নদীর অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। দখল উচ্ছেদ করতে হবে, নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে,’ স্মৃতি হাতড়ে বলেন কচি।
২০১৪ সালে সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় বড় গণসমাবেশ। এরপর একের পর এক মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা, গণসংযোগ— নদীর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চলতে থাকে কর্মসূচি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিনিধি ও দেশের বিশিষ্ট পরিবেশকর্মীরাও এতে যুক্ত হন।
দীর্ঘদিনের এই চাপ ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ধলেশ্বরী পুনর্খননের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। সেই প্রকল্পকে নদী রক্ষার বড় একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন আন্দোলনকারীরা। তার কাছে নদী বাঁচানোর আন্দোলন মানে শুধু একটি নদীর পানি ফিরিয়ে আনা নয়; নদীর সঙ্গে যে কৃষক, জেলে, নৌকার মাঝি, নদীপাড়ের মানুষ আর একটি পুরো জনপদের জীবন জড়িয়ে আছে— তাদের ভবিষ্যৎটাও বাঁচিয়ে রাখা।
শরীর এখন আগের মতো সহযোগিতা করছে না। তাই আন্দোলনের মাঠে তার উপস্থিতি কিছুটা কমেছে। কিন্তু চিন্তার জায়গাটিতে তিনি আজও সক্রিয়। জীবনের ৭২ বসন্ত পেরিয়ে তার উপলব্ধি, মানুষ আর প্রকৃতি আলাদা কিছু নয়। নদী শুকিয়ে গেলে মানুষের জীবন শুকিয়ে যায়। গাছ হারালে শ্বাস হয় বিপন্ন। জলাশয় হারালে বদলে যায় একটি জনপদ। মরে যায় একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকা, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য এবং মানুষের বহু পুরনো স্মৃতি। আর তাই আজ অবধি তিনি আছেন গাছের পাশে, নদীর পাশে।






