‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গীদের শায়েস্তা করতে কতটা সক্ষম ইরান?

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই। ফাইল ছবি / রয়টার্স
ইরানের পাল্টা জবাব কি মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও যাবে?
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দেওয়া যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগ থমকে আছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই শনিবার এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে ইরানের দুর্বল অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
কী বলেছে ইরান
রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে কোনো দেশ যুক্ত হলে ইরান তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে। এমন দেশকে ‘ভূমিকম্পের মতো’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন রেজাই। তিনি বলেছেন, তারা যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথেও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। ফলে সেখানে নতুন করে বাধা তৈরি হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার এক ডজনের বেশি স্থানে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। জর্ডানসহ পুরো অঞ্চলে হাজারো মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে।
ইরান কীভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারে
রেজাই ইরানের পাল্টা ব্যবস্থার তিন ধাপের কথা বলেছেন। প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যেতে বলা হবে।
তারা এতে রাজি না হলে ওই দেশের স্বার্থে হামলা চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
হরমুজের বাইরে বিকল্প রপ্তানি পথেও হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন রেজাই। এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ। হরমুজে বাধা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব এই পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করেছে।
ইরান ইতিমধ্যে হরমুজে অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ চালাচ্ছে। এতে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে আগেই প্রতিরোধ তৈরি করতে চাইছে। অর্থাৎ, কোনো দেশ হামলার প্রস্তুতি নিলেও ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে—এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, ইরানের নতুন কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, সম্ভাব্য হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, হামলা হলে বড় ধরনের পাল্টা আঘাতের মাধ্যমে তার খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।
উপসাগরীয় দেশগুলো কি যুক্তরাষ্ট্রের পাশে যাবে
এখনও তা স্পষ্ট নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আবার তারা ইরানের প্রতিবেশীও।
ইরানের হামলায় এসব দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের বড় নির্ভরতা রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। দেশটি ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলেছে। তবে ইরান ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তারপরও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে পুরোপুরি বিরোধে জড়াতে চাইবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ইরান তাদের প্রতিবেশী। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তাদের নিজেদের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
সৌদি আরব ও ইরান ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতও ২০২২ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হামলা এসব সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তবে তা পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলাতে পারবে না। ইরানের পাশেই তাদের থাকতে হবে। তারা ইরানে এমন কোনো অস্থিরতা চায় না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তৈরি হয়।
আরেক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি বলেছেন, কূটনীতির মাধ্যমে সংকট শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আস্থা কম। তবে এই অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ চালানোর সামর্থ্য রাখে না।
বিশ্বের তেল মজুতও আগের তুলনায় কম। যুদ্ধের বিরতির সময়ে মজুত পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘ যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চলছে ১৯৭৯ সাল থেকে। ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম নিষেধাজ্ঞা দেয়। তখন ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ এবং দেশটির প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল।
১৯৯৫ সালে তেল ও গ্যাস খাতে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগে আরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
২০০৬ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরে এসব নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়।
২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করে। এর আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এটিকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘সর্বোচ্চ চাপের’ নীতি হিসেবে তুলে ধরে।
২০১৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামাসহ বিভিন্ন খাতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
২০২০ সালে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে বাগদাদে ড্রোন হামলায় হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনও অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছিল।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও আবার কার্যকর হয়।
সামনে কী হতে পারে
ইরানের হুঁশিয়ারি এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে নয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হতে যাওয়া দেশগুলোকেও এর আওতায় আনা হচ্ছে।
এতে উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। আবার ইরানের সঙ্গে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও রয়েছে।
ফলে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দিকটি পুরোপুরি সমর্থন করলে ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। আর ইরান যদি হরমুজ বা বিকল্প তেল রপ্তানি পথে আঘাত করে, তাহলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অর্থাৎ, অর্থনৈতিক চাপ এখন যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে চাপে ফেলতে চাইছে। ইরান পাল্টা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। এর ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে অর্থনৈতিক সংঘাতও আরও বড় আকার নিতে পারে।
সূত্র : আল জাজিরা







