রিজার্ভে চাপ বাড়াচ্ছে রূপপুর, জ্বালানি খাতে ১২ ঝুঁকি
- প্রাতিষ্ঠানিক-রাজনৈতিক-আর্থিক ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছে জনগণ
- বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা ও উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, কিন্তু সুশাসনে দুর্বলতার রেকর্ড
- দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে নিয়োগ হবে ২৩ আন্তর্জাতিক ড্রিলিং ঠিকাদার

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
ঘরে বা বাইরে, অফিস বা কারখানা— সবখানেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো জ্বালানির জন্য হাহাকার। অথচ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতার নেই ঘাটতি। রয়েছে বড় বড় কেন্দ্র। কিন্তু জ্বলছে না আলো। কারণ ভেঙে পড়েছে ব্যবস্থাপনা। পুরো জ্বালানি খাত বছরের পর বছর চলেছে ভুল সিদ্ধান্তে। ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণেই বর্তমান সংকট।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) তৈরি করেছে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো (২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১)। সেখানে চিহ্নিত করা হয়েছে জ্বালানি খাতের জন্য ১২টি সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি।
যার মধ্যে অন্যতম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তাঝুঁকি। কেন্দ্রটি চালুতে দেরি হচ্ছে। রূপপুরের ঋণ পরিশোধ ও সৌরবিদ্যুতের অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি আমদানিতে বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রা খরচের চাপ। এ ছাড়া রয়েছে এলএনজির দাম বৃদ্ধি ও হরমুজ প্রণালি সংকট, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কর্মসূচির দুর্বলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতা এবং পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন তথ্যের ফাঁকফোকর। ফলে সব মিলিয়ে হুমকিতে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা। যদিও এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিকল্পনা করছে সরকার। জিইডির ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে তুলে ধরা হয়েছে বিষয়গুলো। পাশাপাশি বলা হয়েছে— এ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছে দেশের জনগণ।
ফ্রেমওয়ার্কটি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘দেশের জ্বালানি রূপান্তর জরুরি। বৃহত্তর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের প্রতি সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়বদ্ধতা হচ্ছে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং ক্রমবর্ধমান পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থা অন্যান্য অবকাঠামোগত লক্ষ্য পূরণে কাজ করে। এটি শিল্প প্রতিযোগিতা, দারিদ্র্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা এবং জাতীয় মর্যাদার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শর্ত। এজন্য দেশের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা অর্জনের লক্ষ্যে নীতিমালা ও কৌশলগত কর্মকাঠামোর মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’
জিইডি বলছে, জ্বালানি খাত ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামোর মেয়াদে প্রবেশ করেছে। বিদ্যুৎ খাতের স্থাপিত ক্ষমতা ও উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, কিন্তু সুশাসনের রেকর্ড দুর্বলতা আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম সৌরশক্তি রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে ও এর উপকূলীয় বায়ুশক্তির সম্ভাবনা আনুমানিক ১ লাখ ৩৪ হাজার মেগাওয়াট। এ ছাড়া রয়েছে অভ্যন্তরীণ গ্যাস সম্পদ, যার ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনার তুলনায় অনুসন্ধানে দীর্ঘকাল ধরে অপর্যাপ্ত অর্থায়ন করা হয়েছে। দেশের সম্পদ এবং নীতিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতা রয়েছে। এই ব্যর্থতা প্রযুক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার। সেই ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছে দেশের জনগণ।
ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা: ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে ৮০ শতাংশ এলএনজি আমদানি বজায় রাখা, চলতি অর্থবর্ষের মধ্যে তিনটি নতুন চুক্তি সম্পন্ন এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাসকূপ খনন ত্বরান্বিত করা হবে। পাশাপাশি ব্যাকআপ হিসেবে মাতারবাড়ী উপকূলীয় এলএনজি টার্মিনাল সচল রাখা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতা: ছয় মাসের মধ্যে এ খাতের সমস্যাগুলোর সমাধান, ত্রৈমাসিক সৌর নিলাম চালু এবং সার্বভৌম বিনিয়োগ নিশ্চয়তা ধারা পুনর্বহাল রাখা হবে। এ ছাড়া স্থিতিশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি তৈরি করা হবে।
বিপিডিবির আর্থিক পতন: এই ঝুঁকি উত্তরণে চলতি মাস থেকে ত্রৈমাসিক শুল্ক যৌক্তিকীকরণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া প্রথম বছরে কমপক্ষে পাঁচটি পিপিএ (বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি) নিয়ে পুনঃআলোচনা করা হবে। আইএমএফের কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংস্কারগুলোতে সমন্বয় করা হবে।
রূপপুর কেন্দ্র চালুতে দেরি ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা: ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথম বছরে গ্রিড প্রস্তুতি মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া সমান্তরালভাবে সঞ্চালন ব্যবস্থা উন্নত, রাশিয়ার রোসাটমের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি চূড়ান্ত এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সনদ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মানদণ্ড পূরণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কর্মসূচির দুর্বল কর্মক্ষমতা: প্রথম ত্রৈমাসিকে বাপেক্সকে এডিপি তহবিল দেওয়া হবে। এ ছাড়া ২৩টি আন্তর্জাতিক ড্রিলিং ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি প্রথম বছরে দুটি অফশোর পিএসসি (সমুদ্রভিত্তিক উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি) করা হবে। সেই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে থ্রি-ডি সিসমিক জরিপ পরিচালনা করা হবে।
গ্রিড অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা নবায়নযোগ্য জ্বালানি একীভূতকরণে বাধা: এই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথম বছরে গ্রিড স্থিতিশীলতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া সঞ্চালন ক্ষমতার সঙ্গে সৌরশক্তির বিস্তারকে সমন্বয়, ২৫০০ মেগাওয়াট ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে এইচভিডিসি আপগ্রেড (হাইভোল্টেজ ডিরেক্ট কারেন্ট) করা হবে।
সবুজ অর্থায়ন সংহতকরণে ব্যর্থতা: চলতি অর্থবছরের মধ্যে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সার্বভৌম সবুজ বন্ড ইস্যু করা হবে। এ ছাড়া কার্বন ট্রেডিং চালু, ছয় মাসের মধ্যে অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম স্থাপন এবং প্রথম বছরে নবায়নযোগ্য ক্রয় বাধ্যবাধকতা (আরপিও) প্রবিধান চূড়ান্ত করা হবে।
পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন তথ্যে ফাঁকফোকর: এই ঝুঁকি কমাতে ছয় মাসের মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জ্বালানি রূপান্তর সমন্বয় ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হবে। ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক করা, ডেটা একটি সমন্বিত ড্যাশবোর্ডে একীভূত এবং বার্ষিক স্বাধীন মূল্যায়ন পরিচালনা করা হবে।
জলবায়ুজনিত কারণে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি: এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সবগুলো প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন এবং বিতরণ সম্পদের জলবায়ুগত ঝুঁকি মূল্যায়ন পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া নতুন জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সহনশীলতার মানদণ্ড তৈরি, চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনার পর দ্রুত সরবরাহ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি জরুরি মেরামত তহবিল প্রতিষ্ঠা করা হবে।
নবায়নযোগ্য সরঞ্জাম আমদানির ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় চাপ: সৌর ও বায়ুশক্তির যন্ত্রপাতির জন্য একটি পর্যায়ক্রমিক স্থানীয় উপাদাননীতি তৈরি করা হবে। এ ছাড়া যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে সরবরাহকারী অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
রূপপুর ঋণ পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি সুসংগঠিত পরিশোধ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে, যার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাফার এবং অর্থায়নকারী পক্ষের সঙ্গে পরিশোধের শর্তাবলি পুনঃআলোচনার সম্ভাবনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আধুনিক গ্রিড অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা দুর্বলতা: বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের যৌথ তত্ত্বাবধানে স্ক্যাডা সিস্টেম এবং উন্নত মিটারিং অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য একটি বিশেষায়িত সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা হবে। সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো তৈরি করা হবে।
সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বিকল্প নেই। স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সুফল আসবে।’






