ভান্ডালজুরি পানি শোধনাগার চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘সাদা হাতি’
- মাসে আয় ৬ লাখ ব্যয় দেড় কোটি
- সক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশ পানি উৎপাদন
- নলকূপে নির্ভরশীল মানুষ সংযোগ নিতে অনাগ্রহী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার আবাসিক এলাকার মানুষের জন্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০ বছর আগে চট্টগ্রাম ওয়াসা হাতে নিয়েছিল ভান্ডালজুরি প্রকল্প, যা বাস্তবায়নে ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা এসেছে বিদেশি ঋণ থেকে। এক বছর আগে শেষ হয়েছে প্রকল্পের কাজ। কিন্তু প্রকল্প এলাকা গভীর নলকূেপর পানির ওপর নির্ভরশীল। গ্রাহকরা আগ্রহী নন ওয়াসার এই সংযোগে। ফলে বিপুল বিনিয়োগের এই প্রকল্প এখন পড়ে রয়েছে অকার্যকর হয়ে।
প্রকল্প চালু রাখতে প্রতিদিন পানি উৎপাদন করা হচ্ছে, যদিও তা সক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশ। প্রতি মাসে এক থেকে দেড় কোটি টাকা পরিচালনা ব্যয়ের বিপরীতে আয় হচ্ছে মাত্র ৬ লাখ টাকা। প্রকল্প শুরুর আগে যথাযথ সমীক্ষা না হওয়ায় এটি এখন ওয়াসার ‘সাদা হাতি’তে পরিণত হয়েছে, যা রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল ব্যয় হলেও আদতে আসছে না কোনো কাজে। প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রতিবেদনেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিপুল এই বিনিয়োগকে ‘জনগণের টাকার অপচয়’ হিসেবে মন্তব্য করা হয়। নগরীর দামপাড়ায় ওয়াসার প্রধান কার্যালয় থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে বোয়ালখালীর ভান্ডালজুরির কর্ণফুলী নদীর তীরে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান এই পানি শোধনাগারের। যেখানে নদীর মিঠা ও স্বচ্ছ পানি সংগ্রহের পর পরিশোধনের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করে সরবরাহ করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের জন্য যে ঋণ নেওয়া হয়, তা কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ শুরু করতে হয়। কিন্তু যে প্রকল্প তার সক্ষমতার ১০ শতাংশও ব্যবহার করতে পারছে না, সেটির ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও মূল বিনিয়োগ তুলে আনা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। প্রকল্পটি অকার্যকর পড়ে থাকার কথা স্বীকার করলেন চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম। তিনি বললেন, ‘এটি অপরিহার্য ছিল না। বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে পানির চাহিদা মেটানো যেত। কিন্তু এত টাকা বিনিয়োগের পর এটা তো আর ফেলে রাখা যায় না। প্রকল্পটি কার্যকর করতে কাফকোসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তবে কর্ণফুলী টানেলের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন টেনে বন্দর-পতেঙ্গায় পানি সরবরাহে টানেল কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি পেয়েছি।’
প্রকল্প নেওয়ার আগে যথাযথ সমীক্ষা হলে এটি কার্যকর হলো না কেন— সে প্রশ্ন তুললেন চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলছিলেন, ‘সমীক্ষায় যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো পূরণে সব এলাকায় সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন। ওয়াসাকে পানির দাম কমাতে হবে। সস্তায় যদি কেউ ভূগর্ভের পানি পায়, তাহলে অতিরিক্ত দাম দিয়ে ওয়াসার সংযোগ কেন নেবে?’
চট্টগ্রাম ওয়াসার সূত্র অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি শুরু হয়। দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বেড়ে শেষ পর্যন্ত খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৯৫ কোটি ১৬ লাখ টাকায়। এই ব্যয়ের বড় অংশ, অর্থাৎ ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণ। বাকি ৭৫১ কোটি টাকা সরকারি তহবিল। ২০ কোটি টাকা এসেছে ওয়াসার নিজস্ব তহবিল থেকে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয় প্রকল্পটির কাজ।
নথি অনুযায়ী, দৈনিক ৬ কোটি লিটার পানি শোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্পের মাধ্যমে বোয়ালখালী, পটিয়া, কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার আবাসিক এলাকায় পানি দেওয়ার কথা। এ ছাড়া আনোয়ারায় অবস্থিত সার কারখানা কাফকো ও সিইউএফএল, কোরিয়ান ইপিজেড, চায়না ইকোনমিক জোনের পানির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যও ছিল। এর আওতায় শোধনাগারের পাশাপাশি ১৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন এবং আনোয়ারা ও পটিয়ায় দুটি বড় জলাধার নির্মাণ করা হয়।






