ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া মাছ

মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির আগেই জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করছেন অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সরদার। এই গবেষণার জন্য তিনি এবারের জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক) লাভ করেছেন। তাকে নিয়ে লিখেছেন আমান উল্লাহ
একটি মাছ হারিয়ে যেতে পারে নদী থেকে। কোনো প্রজাতি একসময় চলে যেতে পারে বিলুপ্তির তালিকায়। কিন্তু প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরও কি ধরে রাখা যায় সেই মাছের সম্ভাবনা? আবার কি ফিরিয়ে আনা যায় মাছটিকে? এই উত্তর খুঁজতে ২৪ বছর ধরে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম সরদার। মাছের শুক্রাণু তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে পোনা উৎপাদন, উন্নত পোনা তৈরি এবং মাছের বিপন্ন প্রজাতি রক্ষার পথ তৈরি করেছেন।
তার গল্পটির শুরু বাংলাদেশে নয়। পিএইচডি করার সময় সুইজারল্যান্ডে পাশের একটি ল্যাবে ক্রায়োপ্রিজারভেশন প্রযুক্তি (বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জীবন্ত কোষ, টিস্যু, শুক্রাণু, ডিম্বাণু বা ভ্রূণ অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা) নিয়ে কাজ করতে দেখেছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম সরদার। গবাদি পশুর প্রজননে সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করা গেলে মাছের ক্ষেত্রেও কি একই প্রযুক্তি কাজে লাগানো সম্ভব? তার মনে জেগেছিল এই প্রশ্ন। দেশে ফিরে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় তার গবেষণা। ২০০২ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের ডিএফআইডি প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশে পুরোদমে কাজ শুরু করেন। তখন মাছের শুক্রাণু সংরক্ষণের প্রযুক্তি দেশে প্রায় নতুন। গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংকটের পাশাপাশি ছিল তরল নাইট্রোজেন সংগ্রহের সমস্যাও।
তাই গবেষণা শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। ঢাকায় পাওয়া তরল নাইট্রোজেন বাসে করে ময়মনসিংহে নিয়ে আসতে হয়েছে। গবেষণার প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করাই যখন বড় চ্যালেঞ্জ, তখন নতুন একটি প্রযুক্তি দাঁড় করানো ছিল আরও কঠিন। কিন্তু সীমাবদ্ধতা তাকে থামাতে পারেনি। বিভিন্ন প্যারামিটার নিয়ে বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা েশষে প্রায় এক দশক পর ২০১০ সালে আসে বড় সাফল্য। এরপর ২০১৫ সালের দিকে তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। গবেষকরা নিশ্চিত হন, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় তরল নাইট্রোজেনে মাছের শুক্রাণু সংরক্ষণ করা যায়। পরবর্তী সময়ে তা ব্যবহার করে নিষিক্তকরণ সম্ভব। অধ্যাপক ড. রফিকুলের গবেষণায় সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে কার্যকরভাবে পোনা উৎপাদনের সাফল্য পাওয়া গেছে।
এই প্রযুুক্তিতে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের শুক্রাণু জিনব্যাংকে বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা হয়। পরে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যায়
হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় মাছ রক্ষায় ড. রফিকুলের প্রযুক্তিটি হলো ‘মাছের স্পার্ম ক্রিয়োপ্রিজারভেশন প্রযুুক্তি’। এর মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের শুক্রাণু জিন ব্যাংকে বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা হয়। পরে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। কাতলা, রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প ও গ্রাস কার্প— এই ছয় প্রজাতির মাছে প্রযুক্তিটির সফল প্রয়োগ হয়েছে। সংরক্ষিত শুক্রাণু থেকে উৎপাদিত পোনার বৃদ্ধি, গঠন ও রোগ প্রতিরোধের বিভিন্ন ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সংরক্ষিত মানসম্পন্ন শুক্রাণু থেকে উৎপাদিত পোনার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে, দৈহিক গঠন সুন্দর ও মানসম্মত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে ও মৃত্যুর হার কমে যায়। উৎপাদন ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনাও উঠে এসেছে গবেষণায়।
বাংলাদেশের নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে একসময় অসংখ্য দেশীয় মাছের বিচরণ ছিল। আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত আহরণ, পানিদূষণসহ নানা কারণে অনেক প্রজাতিই এখন হুমকির মুখে। নদী, খাল-বিল থেকে কোনো প্রজাতি একবার হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু বিলুপ্তির আগেই তার জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে সেই প্রজাতির পুনরুৎপাদনের সুযোগ থাকে। এ জায়গাতেই ক্রায়োপ্রিজারভেশন হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম সরদার প্রায় ২০টি দেশীয় প্রজাতির মাছ নিয়ে কাজ করেছেন। এর মধ্যে বিপন্ন প্রজাতিও রয়েছে। মহাশোলের মতো মাছের শুক্রাণু সংরক্ষণ করা হয়েছে তার গবেষণাগারে। এখন প্রায় এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত শুক্রাণু রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো প্রজাতি প্রকৃতি থেকে সংকটের মুখে পড়লে সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সেই মাছের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
এ ভাবনাই আরও বড় পরিসর পেয়েছে জিনব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর কেন্দ্রীয় হ্যাচারি এবং সিরাজগঞ্জের নিমগাছি ফিশ হ্যাচারিতে দুটি জিনব্যাংক তার উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত জিনগত সম্পদ ভবিষ্যতে মাছের প্রজনন, প্রজননক্ষম মা-বাবা মাছ নির্বাচন করে তাদের খাদ্য ও পরিবেশ উন্নত করে জিনগত মান বাড়িয়ে মানসম্পন্ন ও রোগমুক্ত পোনা উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সরদার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তিটিকে মাঠপর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগও প্রথম শুরু করেন। ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় মৎস্য অধিদপ্তরের ৩৬টি হ্যাচারিকে কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহ, যশোর, ফরিদপুর ও বরিশালের ১৪টি সরকারি-বেসরকারি হ্যাচারিতে ২০২০ সাল থেকে শুরু হয় জিন ব্যাংকিং ও পোনা উৎপাদনের কার্যক্রম। এজন্য হালদা ও পদ্মা নদী থেকে কাতলা, রুই ও মৃগেলের বিশুদ্ধ প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি চীন থেকে সংগ্রহ করা হয় সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প ও গ্রাস কার্পের বিশুদ্ধ প্রজাতি।
তার দীর্ঘ গবেষণাযাত্রায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের ৩০ জন শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছেন। এখন তার সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত তার গবেষণার বড় অংশ স্বাদুপানির মাছকে কেন্দ্র করে হলেও সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা দেখছেন অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সরদার। প্রজাতিভেদে সংরক্ষণ মাধ্যম, তাপমাত্রা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।








