হিমালয় এক চিরন্তন রহস্য আদিম অনিশ্চয়তা
- খ্যাপা দেশগুলোর অদম্য জেদেই সর্বনাশ

হিমালয়কে মানুষ যতবার জয় করার চেষ্টা করেছে, ততবারই পাহাড় মনে করিয়ে দিয়েছে তার নিজেরও একটি ভাষা আছে। সেই ভাষা কখনো তুষারধস, কখনো ভূমিধস, কখনো হিমবাহ ভেঙে নেমে আসা জলরাশি। গত ২৬ আগস্ট, বুধবার সকালে চীন-নেপাল সীমান্তে সেই ভাষাই যেন ফের ভয়াবহ হয়ে উঠল। পাহাড়ের ওপর থেকে হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ল। তার সঙ্গে নামল পাথর, কাদা আর জল। মুহূর্তে বিপর্যস্ত হলো বসতি, রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২৯ আগস্ট পর্যন্ত নেপাল ও সীমান্তের চীনা অংশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার। অথচ এই বিপর্যয়ের সঙ্গে কোনো মানবনির্মিত পরিকাঠামো সরাসরি যুক্ত ছিল— এমন প্রমাণ এখনো নেই।
তবু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। যে ভূখণ্ড পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ, পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, সেখানে মানুষ কি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এমন এক পরিকাঠামোর জাল বিছিয়ে ফেলছে, যার সব বিপদ এখনো সে বোঝেইনি?
হিমালয়ের নদীগুলো নেমে এসেছে হিমবাহ থেকে। সেই নদীর জলের ওপর নির্ভর করে ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার কোটি কোটি মানুষের জীবন। একই নদী আবার জলবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চীন, ভারত ও নেপাল গত কয়েক বছরে পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করছে বাঁধ, সুড়ঙ্গ, রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি হিসাব— সীমান্তে কৌশলগত উপস্থিতি।
এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় চীন। বেজিংয়ের কাছে তিব্বত শুধু প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল নয়। জাতীয় নিরাপত্তা এবং শক্তি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তিব্বতকে জলবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য শক্তির বিশাল কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। ইয়ালুং সাংপো নদীর ওপর নির্মীয়মাণ প্রায় ১৬৮ বিলিয়ন ডলারের মেগা বাঁধ তার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদাহরণগুলোর একটি। প্রায় ২ হাজার মিটার উচ্চতার পতনকে কাজে লাগিয়ে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বিদ্যুৎ পৌঁছবে চীনের দূরবর্তী পূর্বাঞ্চলে। তিব্বত জুড়ে এরই মধ্যে তৈরি হচ্ছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, পাশাপাশি সৌর ও বায়ুশক্তির পরিকাঠামো এবং অতিউচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা। চীনের এই তৎপরতার পেছনে শুধু বিদ্যুতের চাহিদা নেই। ১৯৫৯ সালে দালাই লামার নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তিব্বতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার ক্ষেত্রেও পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। বিতর্কিত সীমান্তে নতুন বসতি ও যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালে চীন ও ভারতের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষও দেখিয়েছে, হিমালয়ের পরিকাঠামো এখন নিরাপত্তা রাজনীতিরও অংশ।
পিছিয়ে নেই ভারতও। চীনের প্রকল্পের ভাটিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এগিয়ে নিচ্ছে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সীমান্তে তৈরি হচ্ছে সুড়ঙ্গ, রাস্তা ও রেলপথ। যেগুলো সেনা এবং অন্যান্য সম্পদ দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। নেপালও তার হিমালয়নির্ভর নদীগুলোয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়াচ্ছে। কখনো ভারত, কখনো চীনের অর্থায়ন সেখানে প্রভাব ফেলছে।
এবার সমস্যা অন্যত্র। পাহাড়কে কেটে সুড়ঙ্গ করা, বিস্ফোরক দিয়ে শিলা ভাঙা, প্রাকৃতিক ভূখণ্ডে বিপুল পরিমাণ কংক্রিট ঢালা, নদীর জল আটকে জলাধার তৈরি— প্রতিটি কাজেরই পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। ভূমিধস, ধস নামা কাদা-পাথরের স্রোত এবং হিমবাহের হ্রদ আচমকা ফেটে ভয়াবহ বন্যা— এসব হিমালয়ের পরিচিত বিপদ। জলবায়ু পরিবর্তন সেই বিপদকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বুধবারের ভোটেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোও বড় ধাক্কা খায়। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র মিলিয়ে ১২টি বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মোট ৪৩১ দশমিক ১ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা। নির্মাণাধীন আরও ১৫টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত ক্ষমতা প্রায় ৪৭০ মেগাওয়াট।
বিপদের শেষ এখানেও নয়। ভূমিধসের পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী জলাধার বা ‘ব্যারিয়ার লেক’। সেই জলাধারের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তে বিপুল জল নেমে এসে ফের ভয়াবহ বন্যা তৈরি করতে পারে। ফলে একদিকে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষকে উদ্ধারের লড়াই, অন্যদিকে নতুন করে জল নেমে আসার আশঙ্কা— এ দুই বিপদের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের।
বিপর্যয়ের পর চীনের বাঁধ ভেঙেই এই বন্যা হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়েছিল। তবে তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। নেপালে চীনা দূতাবাসও দাবিটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে জানিয়েছে। শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নেপালকে উদ্ধারকাজে সাহায্যের আশ্বাস দেন।







