Agamir Somoy E-Paper
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
জনকল্যাণে বাবা-ছেলের দৃষ্টান্ত
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

advertiseadvertise
আগামীর সময় কলাম

নেপাল ট্রাজেডি

উন্নয়নের ডিনামাইটে ক্ষতবিক্ষত হিমালয়

  • প্রলয়ংকারী দুর্যোগে কিস্তি শোধ
সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
agamir somoy
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ২০:৩৫
উন্নয়নের ডিনামাইটে ক্ষতবিক্ষত হিমালয়

নেপালের বন্যায় নিখোঁজদের ছবি দেখছেন স্বজনরা। ছবি: রয়টার্স

হিমালয়কে নেপাল আর চীনের মানুষরা অনেক দিন ধরেই আর পাহাড় থাকতে দেয়নি। এক সময়ে তার মাথায় অনেক বরফ ছিল, বুকের মধ্যে পাথর, পায়ের কাছে নদী। মেঘ এসে তার গায়ে ঘুমোত, বরফ গলে সরু জলধারা হয়ে নিচে নামত, কোনো নামহীন পাখি খাদে বাসা বাঁধত। মানুষ ছিল নিচে। ছোট ছোট ঘর, সরু পথ, অল্প আলো। মানুষ তখন নিচে থাকত, পাহাড় ওপরে। দুজনের উচ্চতার তফাতটুকু অন্তত পরিষ্কার ছিল।

তারপর একদিন এলো নগরায়নের বান। বড় দেশগুলোর উন্নায়নের প্রলোভন। টাকা ধার নাও। রাস্তাঘাট করো। একদিন যেনো সেই প্রমত্ত উন্নায়নের তোড়েই মানুষ পাহাড়ের চাইতে বড় হয়ে গেলো।

সে বলল, এই নদী শুধু নদী হয়ে বয়ে যাবে কেন বিদ্যুৎ দিক। এই পাহাড় শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? তার পেটের মধ্যে সুড়ঙ্গ হোক। এই ঢাল এত জায়গা নিয়ে পড়ে আছে কেন? কেটে রাস্তা বানাও। ওই পাথর ভাঙো, এখানে বাজার বসাও, সেখানে হোটেল, আরেকটু ওপরে সীমান্তবন্দর। নদীকে বাঁধো, পানি ঘোরাও, টারবাইন বসাও। বিদ্যুৎ বানাও। এভাবেই হিমালয়কে তারা আর আর হিমালয় থাকতে দিল না।

নেপালের দিক থেকে উঠল ড্রিল। চীনের দিক থেকে এলো দানবীয় বুলডোজার। একদিকে জলবিদ্যুৎ, অন্যদিকে সড়ক আর সুড়ঙ্গ, সীমান্তবাণিজ্য, পর্যটন, নতুন বসতি। দুই দেশের আগ্রাসী উন্নয়নের ধাক্কায় ক্ষয়ে যেতে লাগল ওই পাহাড়ের মেরুদণ্ড। তিল তিল ক্ষয়ে যাওয়া মেরুদণ্ড নিয়ে বরফের নিচে এতদিন চুপ করে শুয়ে ছিল লাংটাং লিরুং।

২৬ আগস্ট সকালে সেই নীরব পাহাড় হঠাৎ যেন নিজের আড়মোড়া ভাঙ্গলো। লাংটাং লিরুংয়ের বরফ-ঢাকা উত্তর ঢাল থেকে বিশাল হিমবাহ আর শিলার স্তূপ খুলে কয়েক হাজার ফুট নিচে নেমে এল প্রথমে যেন সাদা একটি বিশালকায় দানবীয় বরফের স্তূপ। তারপর মুহূর্তেই তা হয়ে গেল কালচে ধূসর পাথর, কাদা, বরফ আর পানির উন্মত্ত স্রোতের ঘন মিশ্রণ। যে বরফ হাজার বছর ধরে পাহাড়ের গায়ে নিশ্চুপ শুয়ে ছিল, সে নেমে আসতে লাগল উম্মত্ত গতিতে। চলার পথে পাথর ভাঙল, গাছ ছিঁড়ল, মাটি তুলে নিল, নদীকে নিজের শরীরে মিশিয়ে ফেলল। নেপালের লেন্দে খোলা আর ভোটে কোশির সরু জলপথ তখন আর নদী নয়, যেন এক দুরন্ত দানবীয় কাদার পাহাড় ছুটে চলছে। সামনে যা পেয়েছে- সেতু, গাড়ি, দোকান, ঘর, সীমান্তচৌকি, বিদ্যুৎকেন্দ্র সব লণ্ড ভণ্ড করে নিজের শরীরে মিশিয়ে নিয়েছে। কোথাও মানুষ পেছনে তাকিয়ে দৌড়েছে, কিন্তু পেছনের ধূসর সেই দেয়াল মানুষের চেয়ে গতিতে দ্রুত ছিল। কোথাও কয়েক সেকেন্ড আগেও দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি পরের দৃশ্যে আর নেই। পানির সঙ্গে ভেসে গেছে কাঠ, টিন, গাড়ির অংশ, ভাঙা দরজা, মানুষের ব্যবহারের ছোট ছোট জিনিস যেন একটি জনপদের ব্যক্তিগত জীবন হঠাৎ নদীর মালিকানায় চলে গেছে। তারপর ক্যামেরায় এসেছে আরও মর্মান্তিক দৃশ্য। কাদার ধারে পড়ে থাকা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন নিথর শরীর, উদ্ধারকারীদের ট্রাকে তোলা মৃতদেহ, নদীর ঘোলা স্রোতে ভেসে যাওয়া মানবদেহের ছায়া, আর তীরের মানুষগুলো স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে সেই দিকে, যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল তাদের ঘর, তাদের বাজার, তাদের স্বজন। এটাই এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে নির্মম দৃশ্য।

পাহাড়ের একটি মস্ত অসুবিধা আছে। সে ব্যবসা বোঝে না।

তার মাথায় বরফ থাকলে সে হিসাব করে না, এই বরফ গলিয়ে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হবে। বুকের মধ্যে নদী থাকলে ভাবে না, প্রতি ঘনমিটার পানির বাজারদর কত। পাথরকে সে পাথরই ভাবে। বনকে বন। ঝরণাকে ঝরণা। মানুষের মতো এত বুদ্ধি তার হয়নি।

ধ্বংস্তূপে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। ছবি: রয়টার্স

মানুষের উন্নয়নের ভাষা অবশ্য পাহাড় বোঝে না। শব্দগুলো শুনলে বেশ ভালই লাগে। হডরেস টানেল, অ্যাকসেস রোড, ডাইভারশন উইয়ার, ড্রাই পোর্ট, কানেক্টিভিটি করিডর। কিন্তু পাহাড়ের অভিধানটি একটু সেকেলে। সেখানে এগুলোর অর্থ মোটামুটি চারটি। কাটা, ফাটানো, ফুটো করা, সরানো।

এই চারেই নেপাল ও চীনের মাঝখানের আদিম হিমালয় ধীরে ধীরে প্রকৃতির অঞ্চল থেকে উন্নয়ন করিডরে পরিণত হয়েছে। নেপালের দিকে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, পাহাড়ি মহাসড়ক, নতুন বসতি, পর্যটন অবকাঠামো; তিব্বতের গ্যিরংয়ের দিকে বন্দর, সড়ক, সীমান্তবাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তার। নেপাল ও চীনের সরকারি সহযোগিতা কাঠামোতেই সীমান্ত সড়ক, সুড়ঙ্গ, স্থলবন্দর ও সংযুক্ত অবকাঠামো সম্প্রসারণের কথা আছে। গবেষণাতেও উত্তর নেপালের একসময় প্রায় সড়কহীন অঞ্চলগুলোতে দ্রুত পরিবহন অবকাঠামো বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে।

নেপালের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের রাসুয়া জেলায়, লাংটাং ন্যাশনাল পার্কের ভেতর তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে লাংটাং লিরুং। এটি সাত হাজার মিটারের বেশি উঁচু বরফঢাকা শরীর নিয়ে তাকে দূর থেকে শান্তই মনে হয়। যেন পৃথিবী এখানে এসে একটু থেমেছে। কিন্তু পাহাড়ের শান্তি মানুষের শান্তির মতো নয়, একবার নড়লে সব হিসাব মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে যায়। মানুষ সম্ভবত ভেবেছিল, দাঁড়িয়ে থাকাই পাহাড়ের কাজ।

২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে সেই ধারণায় একটি ভয়াবহ ভুল ধরা পড়ল।

লাংটাং লিরুংয়ের বরফে ঢাকা খাড়া ঢালের একটি বিরাট অংশ হঠাৎ পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। শৃঙ্গটির উচ্চতা সাত হাজার দুইশ মিটারের বেশি। বিপর্যয়ের উৎস ছিল প্রায় পাঁচ হাজার দুইশ মিটার উচ্চতার একটি হিমবাহ-আচ্ছাদিত খাড়া অংশে। স্যাটেলাইট ছবিতে কয়েক দিন আগেও যে বরফ ও শিলার অংশটি অক্ষত দেখা গিয়েছিল, ২৬ আগস্ট সেখানে দেখা গেল একটি বিশাল ক্ষত।

সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের কাছাকাছি যেন পাহাড়ের বুক থেকে আরেকটি পাহাড় খুলে পড়ল।

প্রথমে বরফ। তারপর শিলা। তারপর আঘাত। তারপর পৃথিবী নিজেই যেনো নিজের হাড় ভাঙার শব্দ শুনল।

বরফ-পাথরের বিপুল ভর কয়েক হাজার ফুট নিচে আছড়ে পড়ে চূর্ণ হলো। বরফ ভাঙল, পাথর ছিটকে গেল, পানি মিশল, মাটি উঠল। তারপর সেই মিশ্রণ ঢুকে পড়ল লেন্দে খোলার দিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি পাহাড়ি ধস আর ধস থাকল না; হয়ে উঠল বরফ, পাথর, কাদা, পানি, গাছ আর ভাঙা মাটির চলন্ত এক দেহ।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, আঘাতটির শক্তি এত প্রবল ছিল যে ভূকম্পনযন্ত্রে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য শক্তি ধরা পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা পরে আরও একটি ঘটনা ৪ দশমিক ২ মাত্রার সমতুল্য কম্পন সৃষ্টি করে। প্রথমে কেউ কেউ ভেবেছিলেন ভূমিকম্পে পাহাড় ভেঙেছে। পরে বিজ্ঞানীরা দেখলেন ঘটনাটি উল্টো। পৃথিবী কেঁপে পাহাড় পড়েনি, পাহাড় পড়েই পৃথিবী কাঁপিয়েছে।

এরপর শুরু হলো গতি। চীনা ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণে ধ্বংসস্রোতের কোনো কোনো অংশের গতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার, অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর হিসাব পাওয়া গেছে। প্রথম পর্যায়ের ধ্বংসস্রোত বিশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ ছুটে যায়। পরে বন্যা ও ধ্বংসাবশেষ নদীপথ ধরে একশ কিলোমিটারেরও বেশি দূর পর্যন্ত ভূপ্রকৃতি বদলে দেয়।

এই বিধ্বংসী প্রবাহ দ্রুত গতিতে নীচে নামতে থাকে। তারপর টিমুরে। সিয়াব্রুবেসি। বেত্রাবতী। ত্রিশুলি। দেবীঘাট। যে নদী সকালেও মানচিত্রের একটি নীল দাগ ছিল, দুপুরের মধ্যে সে নিজেই মানচিত্র সংশোধন করতে শুরু করেছে। গালছিতে অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পানি প্রায় নয় মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা আইসিমডের তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে। কোথাও বহুতল বাড়ি নদীর দিকে হেলে পড়েছে, কোথাও সেতু নেই, কোথাও রাস্তা নেই, কোথাও বাজারের জায়গায় পড়ে আছে শুধু কাদা। কোনো কোনো এলাকায় বসতির চিহ্ন বলতে ছড়িয়ে থাকা টিনের পাত, কাঠের টুকরো আর উল্টে থাকা গাড়ির শরীর।

ভোটেকোশি ও ত্রিশুলির পানি মানুষকে শুধু বাড়ি থেকে সরিয়ে দেয়নি, মৃতদেহকে জেলা থেকে জেলায় বয়ে নিয়েছে। ২৬ আগস্ট সন্ধ্যার মধ্যেই চিতওয়ানে ত্রিশুলি ও নারায়ণী নদী থেকে বহু মৃতদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার হয়। পরদিন মৃতদেহ উদ্ধারের সংখ্যা আরও বাড়ে। ধাদিং, তানাহুন, নওয়ালপরাসিসহ বহু দূরের নদীতীরেও মানুষের দেহ পাওয়া যায়।

২৯ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নেপালে ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং চীনের তিব্বত অংশেও প্রাণহানি ঘটেছে; নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার। উদ্ধারকাজ চলায় সংখ্যাগুলো এখনও পরিবর্তিত হচ্ছে।

লাংটাংয়ের হিমবাহ ভেঙেছে বলে কোনো নির্দিষ্ট সুড়ঙ্গ, বাঁধ বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান দায়ী করেনি। কোনো নির্মাণকাজ ওই বরফ সরাসরি আলগা করেছে, এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণও এখনো নেই। এই কথাটি পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। কিন্তু এটুকু বলেই মানুষের হাত ধুয়ে ফেলার সুযোগ নেই।

কারণ চীন নেপাল সীমান্তের হিমালয়ের নীচে হিমবাহের নিচের পৃথিবীটি আর আগের পৃথিবী নেই। বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান আইএফসি ত্রিশুলি নদী অববাহিকা নিয়ে করা দীর্ঘ সমীক্ষায় জানিয়েছিল, সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে ৩৬টির বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ছিল বা পরিকল্পনায় ছিল। একই মূল্যায়নে জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন, নতুন রাস্তা, ঢালের অস্থিতিশীলতা, নগরায়ন, বালু-পাথর উত্তোলন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত চাপের কথা বলা হয়েছে। সংখ্যা শুনতে নিরীহ। ছত্রিশ।

কিন্তু ছত্রিশটি প্রকল্প মানে শুধু ছত্রিশটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এর সঙ্গে আছে বাঁধ, পানি গ্রহণের কাঠামো, সুড়ঙ্গ, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎঘর, প্রবেশসড়ক, পাথরখাদান, বিস্ফোরণ, সঞ্চালনলাইন, নির্মাণবর্জ্য, পাহাড়ের ঢাল কাটা এবং নদীর প্রবাহে হস্তক্ষেপ।

একজনকে উদ্ধার করে ক্যাম্পে নিয়ে আসা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

রাসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেই পাহাড়ের ভেতরে চার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ প্রধান জলসুড়ঙ্গ রয়েছে। সঙ্গে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডাইভারশন উইয়ার, টেইলরেস সুড়ঙ্গ ও অন্যান্য অবকাঠামো। আপার ত্রিশুলি-১ প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্যায়নেও অঞ্চলটিকে খাড়া, ভূমিধসপ্রবণ ও ভূকম্পন-সক্রিয় বলা হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য বিস্ফোরণ, সুড়ঙ্গ নির্মাণ ও প্রায় বারো কিলোমিটার প্রবেশসড়কের প্রয়োজন হয়েছে। সেই কারণেই নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে ভূমিধস স্থিতিশীলকরণ, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ এবং ঢাল সুরক্ষার পরিকল্পনা রাখতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৌশলীরাও আগে থেকে জানতেন, অঞ্চলটির পাহাড়ের শরীরটি সুস্থ নয়।

তবু অস্ত্রোপচার চলেছে। আরও বিদ্যুৎ দরকার। আরও রাস্তা দরকার। আরও বাণিজ্য দরকার। আরও পর্যটক দরকার। এই ‘আরও’ শব্দটি সভ্যতার সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দগুলোর একটি।

চীনের দিকেও গল্পটি খুব আলাদা নয়। গ্যিরং উপত্যকা এখন শুধু একটি পাহাড়ি সীমান্ত নয়; এটি চীন-নেপাল বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান দ্বার। স্থলবন্দর, জাতীয় সড়ক, সীমান্ত যোগাযোগ, ভবিষ্যৎ রেল ও সুড়ঙ্গ— দুই দেশের পরিকল্পনায় এই অঞ্চলকে ক্রমেই বড় বাণিজ্য করিডরে রূপান্তর করা হয়েছে।

সমস্যা হলো, জায়গাটি ভূতত্ত্বের দিক থেকে মোটেই বাধ্য ছেলে নয়।

চীন-নেপাল পরিবহন করিডর নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ৪৭টি অতি-বৃহৎ, ২১৩টি বৃহৎ এবং ৩৪৯টি ছোট ও মাঝারি ভূমিধস শনাক্ত করা হয়। আরও ২২৩টি সম্ভাব্য ভূমিধস এলাকা চিহ্নিত হয়, যার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি। গ্যিরং অববাহিকা ও গিরিখাতকে বড় ভূমিধসের বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এরপরে আছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

হিন্দুকুশ-হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। আইসিমডের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত বরফ হারিয়েছে। চিরহিমায়িত মাটি নরম হচ্ছে, উচ্চ পাহাড়ের শিলা ও বরফের বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, তুষার ও বৃষ্টির ধরন বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, দ্রুত হিমবাহ পশ্চাদপসরণ, চিরহিমায়িত মাটি গলে যাওয়া এবং চরম বৃষ্টিপাতের কারণে হিমালয়ের খাড়া ঢাল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। একই সময়ে সড়ক, সেতু, বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এসব সম্ভাব্য ধ্বংসস্রোতের পথের আরও কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।

এখানেই নেপাল ও চীনের উন্নয়ন মডেলের সবচেয়ে বড় বিপদ।

তারা একাই হিমালয়ের বরফ গলিয়েছে এ কথা বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল হবে। হিমালয়ের উষ্ণায়ন একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের অংশ। কিন্তু যে পাহাড়টি উষ্ণ হচ্ছে, যার বরফ কমছে, যার চিরহিমায়িত মাটি নরম হচ্ছে, যার ঢাল জন্মগতভাবেই অস্থিতিশীল, সেই পাহাড়ের শরীরে একই সময়ে যত বেশি রাস্তা, সুড়ঙ্গ, বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, হোটেল, বাজার ও বসতি বসানো হয়, তত বেশি মানুষ ও সম্পদ বিপদের মুখে পড়েছে। ২৬ আগস্ট সেই হিসাবের একটি ভয়ঙ্কর কিস্তি দিয়েছে নেপাল ও চীন। একদিনের বিপর্যয়েই বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেতু গেছে, রাস্তা ভেঙেছে, কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অচল হয়েছে। যে উন্নয়নকে পাহাড়ের শরীরে বসানো হয়েছিল, পাহাড় নেমে আসার সময় তাকেই সঙ্গে নিয়ে গেছে।

২৬ আগস্টের লাংটাং বিপর্যয়কে কোনো নির্দিষ্ট বাঁধ, সুড়ঙ্গ বা রাস্তা নির্মাণ ঘটিয়েছে এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই। ঘটনাটির তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে হিমবাহ ও শিলার অস্থিতিশীলতা, উচ্চতার পরিবেশগত পরিবর্তন এবং ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াই গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু তাই বলে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ লিখে মোটা একটি ফাইল বন্ধ করে দেওয়াও সুবিধাজনক আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ বিপদ প্রাকৃতিক হতে পারে, বিপর্যয়ের পরিমাণ সবসময় প্রাকৃতিক নয়।

একটি বরফখণ্ড জনমানবহীন উপত্যকায় ভেঙে পড়লে সেটি ভূতত্ত্বের ঘটনা। সেই একই সম্ভাব্য ধ্বংসপথে যদি বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাসড়ক, হোটেল, বাজার, শত শত বাড়ি আর হাজার হাজার মানুষ বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার প্রশ্নও হয়ে ওঠে। আর উন্নয়নের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যবস্থাটি হলো, আমরা প্রকৃতিকে খণ্ডে খণ্ডে অনুমতি দিই। রাস্তার ছাড়পত্র এক দপ্তরে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আরেক দপ্তরে। পাথরখাদান তৃতীয় দপ্তরে। হোটেল চতুর্থ দপ্তরে। বন্দর পঞ্চম দপ্তরে। প্রত্যেকটির কাগজ আলাদা। শুধু পাহাড়টি আলাদা নয়। এই সব দপ্তরের চাপ এসে পড়ে একই শরীরে।

স্বজনদের সন্ধানে ক্যাম্প এলাকায় এভাবেই ভিড় জমান শোকাহত নেপালিরা। ছবি: রয়টার্স

উষ্ণায়ন এক দিক থেকে টানে, রাস্তা আরেক দিক থেকে কাটে, সুড়ঙ্গ ভেতরে ঢোকে, বিস্ফোরণ শিলায় কম্পন তোলে, নদীকে বাঁকানো হয়, বন সরিয়ে বসতি বানানো হয়। প্রত্যেক প্রকল্প আলাদা হিসাব জমা দেয়। প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত বিল তোলে ধ্বংস দিয়ে।

একজন দুর্বল রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার করার আগে চিকিৎসক দশবার ভাবেন। হিমালয়ের শরীর দুর্বল হচ্ছে জেনেও নেপাল ও চীন উল্টোটা করেছে। আরও সুড়ঙ্গ করেছে। ডিনামাইট দিয়ে আরও বিস্ফোরণ ঘটিয়েছি। আরও রাস্তা কেটেছে। আরও কংক্রিট চাপিয়েছে। তারপর পাহাড় নড়লে নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ।’ নামটি আরামদায়ক। দায় কম লাগে। মানুষের অনেক অধিকার আছে। বিদ্যুতের অধিকার। রাস্তার অধিকার। বাণিজ্যের অধিকার। পর্যটনের অধিকার। শহর বানানোর অধিকার। সম্ভবত পাহাড়েরও একটি অধিকার ছিল। কেবল পাহাড় হয়ে থাকার অধিকার।নদীর ছিল নিজের বাঁক নিজে ঠিক করার অধিকার। বনের ছিল কোনো জিডিপি না বাড়িয়েও বন হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। হিমবাহের ছিল মেগাওয়াট, পর্যটকের সংখ্যা ও বাণিজ্যের টনেজে অনূদিত না হওয়ার অধিকার। নেপালে প্রকৃতির অধিকারগুলো আইন করে কেড়ে নেওয়া হয়নি। কেড়ে নেওয়া হয়েছে আরও বুদ্ধি খাটিয়ে। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সম্পদ’। নদী হলো জলসম্পদ। বরফ হলো পানিসম্পদ। পাহাড় হলো পর্যটন সম্পদ। গিরিপথ হলো বাণিজ্য করিডর। পাথর হলো নির্মাণসামগ্রী। ‘সম্পদ’ শব্দটির এক অদ্ভুত গুণ আছে। কোনো কিছুকে একবার সম্পদ বলা হলে তাকে ব্যবহার না করা অর্থনীতির চোখে প্রায় অপরাধ হয়ে যায়।ফলে হিমালয়কে তারা অনেক কিছু হতে বাধ্য করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র। মহাসড়ক। সুড়ঙ্গ। সীমান্তবন্দর। পর্যটনকেন্দ্র। ভবিষ্যৎ শহরের জমি। সবই করা হয়েছে শুধু পাহাড়কে পাহাড় থাকতে দেওয়া হয়নি।

২৬ আগস্টের ধ্বংসস্তূপে তাই শুধু বরফ, পাথর, ভাঙা সেতু, ধ্বংস হওয়া বাড়ি আর মৃত মানুষের স্মৃতি পড়ে নেই। সেখানে পড়ে আছে উন্নয়ন সম্পর্কে মানুষের বহু পুরোনো একটি ভুলের ধ্বংসাবশেষও। মানুষ ভুলে গেছে, হিমালয়ের বয়স মানুষের সভ্যতার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি। সে মানুষের অর্থনীতি জানে না, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বোঝে না, বিদ্যুতের ঘাটতিও বোঝে না। সে শুধু নিজের নিয়ম জানে। এবং সেই নিয়মে কোনো ছাড়পত্র লাগে না। হিমালয়কে জয় করার গল্প তাই শেষ পর্যন্ত মানুষের বিজয়ের গল্প নয়। অনেক সময় সেটি মানুষের নিজের সীমা ভুলে যাওয়ার গল্প। ২৬ আগস্ট লাংটাংয়ের বরফ, পাথর, কাদা আর মৃত মানুষের দীর্ঘ সারি আমাদের আবার সেই পুরোনো কথাটিই মনে করিয়ে দিয়েছে।

নেপাল বন্যা
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    Advertisement
    খাল খননে হরিলুট, শ্রমিকদের মজুরি না দিয়েই কোষাগারে টাকা ফেরত ইউএনওর

    খাল খননে হরিলুট, শ্রমিকদের মজুরি না দিয়েই কোষাগারে টাকা ফেরত ইউএনওর

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ২২:১৭

    জীবনের জুটি গড়ে মাঠে ভাঙেন রুবেল

    জীবনের জুটি গড়ে মাঠে ভাঙেন রুবেল

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৪

    বন্দুক হাতে পার্কে ঘোরার ভিডিও ভাইরাল, সেই দুই তরুণ গ্রেপ্তার

    বন্দুক হাতে পার্কে ঘোরার ভিডিও ভাইরাল, সেই দুই তরুণ গ্রেপ্তার

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪১

    বনজীবীদের মনে ভয়, কাঁধে ঋণ

    বনজীবীদের মনে ভয়, কাঁধে ঋণ

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৩

    ‘শারজাহ মডেলে’ সাজতে পারে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর

    ‘শারজাহ মডেলে’ সাজতে পারে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৫

    জনকল্যাণে বাবা-ছেলের দৃষ্টান্ত

    জনকল্যাণে বাবা-ছেলের দৃষ্টান্ত

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৮

    সংকট মেটাতে ‘সার কার্ড’

    সংকট মেটাতে ‘সার কার্ড’

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৮

    দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ

    দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩০

    ‘জিরো কস্টে’ যাচ্ছেন ১০ হাজার, ভয় সেই পুরনো সিন্ডিকেট

    ‘জিরো কস্টে’ যাচ্ছেন ১০ হাজার, ভয় সেই পুরনো সিন্ডিকেট

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৪০

    গভীর রাতে সাবেক সচিবের জমি দখলের অভিযোগ

    গভীর রাতে সাবেক সচিবের জমি দখলের অভিযোগ

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫৯

    নেপাল-তিব্বতের বন্যার ছবি চীনে দেখানো হচ্ছে না কেন

    নেপাল-তিব্বতের বন্যার ছবি চীনে দেখানো হচ্ছে না কেন

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩৭

    ইমরান খানকে জেলে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে, অভিযোগ ছেলেদের

    ইমরান খানকে জেলে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে, অভিযোগ ছেলেদের

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:২৭

    এনসিপির সভাস্থলে পাল্টা কর্মসূচির ডাক, যা বলছে জেলা প্রশাসন

    এনসিপির সভাস্থলে পাল্টা কর্মসূচির ডাক, যা বলছে জেলা প্রশাসন

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:১৬

    গরম না কমলে কমবে না লোডশেডিং

    গরম না কমলে কমবে না লোডশেডিং

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৩

    নেপালের বন্যায় ভেসে আসা সিন্দুক ভেঙে ৯৩ লাখ রুপি চুরি, আটক ২৯

    নেপালের বন্যায় ভেসে আসা সিন্দুক ভেঙে ৯৩ লাখ রুপি চুরি, আটক ২৯

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:২৮

    advertiseadvertise