পাঠকের লেখা
কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটে যেন সীমাবদ্ধ না থাকে
- বিষয়: নারীবান্ধব গণপরিবহন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি শহরের অর্থনৈতিক এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সচল রাখতে গণপরিবহনের ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে বাসের ওপর নির্ভর করেন। এই বিপুল নিত্যযাত্রীদের একটি বড় অংশই নারী। অথচ আমাদের নগর পরিবহনে নারীর যাত্রা আজও স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ হয়ে ওঠেনি। প্রতিদিনের অতিরিক্ত ভিড়, আসন সংকট, অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি বহু নারীর চলার পথের নিত্যসঙ্গী। ব্র্যাকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, গণপরিবহন ব্যবহারকারী ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক। তাই গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আজ আর শুধু নারীদের দাবির বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব।
এই কঠিন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতায় নারীদের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ‘পিংক বাস’ সার্ভিসের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশার আলো জাগায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় প্রাথমিকভাবে নারী যাত্রীদের জন্য এই বাসসেবা চালু করা হয়েছে। বিশেষ এই বাসের চালক ও সহকারী— সবাই নারী। উদ্যোগটির ফলে একদিকে নারীরা যেমন স্বস্তিতে ও নির্বিঘ্নে যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের একটি নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। একজন নারী চালকের হাতে বাসের স্টিয়ারিং শুধু একটি চাকরি নয়; এটি পরিবহন খাতে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা।
নারী চালকের হাতে বাসের স্টিয়ারিং শুধু একটি চাকরি নয়; এটি পরিবহন খাতে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা
পিংক বাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– নারীর নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া। একজন কর্মজীবী নারীকে প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে হয়, ছাত্রীকে যেতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা কোনো মা সন্তানকে নিয়ে যান হাসপাতালে। তাদের সবার জন্য একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন অত্যন্ত জরুরি। যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে শিক্ষা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ আরও ত্বরান্বিত হবে।
তবে প্রশ্ন হলো, শুধু গোলাপি রঙের কয়েকটি বিশেষ বাস চালু করলেই কি পুরো গণপরিবহনব্যবস্থা নারীবান্ধব হয়ে উঠবে? উত্তরটি নিঃসন্দেহে ‘না’। কারণ, একজন নারী শুধু বাসের ভেতরেই নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন না; বাসস্টপে অপেক্ষা করা, ফুটপাত ধরে হাঁটা, ভিড়ের মধ্যে বাসে ওঠা-নামা, রাতের বেলা বাসের অনিশ্চয়তা, চালক-সহকারীর আচরণ এবং হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ– সবকিছুর সঙ্গেই তার সামগ্রিক নিরাপত্তা জড়িত।
তাই পিংক বাসকে দেখতে হবে নারীবান্ধব গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রথম ধাপ হিসেবে। এর পাশাপাশি মূলধারার সব গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও কার্যকর নজরদারি, নিরাপদ বাসস্টপ, সুনির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামানো, সহজ অভিযোগ মাধ্যম এবং হয়রানির ঘটনায় দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নজর রাখা দরকার, পিংক বাস যেন শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং সময়ের স্রোতে এর সংখ্যা ও কার্যকারিতা কমে না যায়। যাত্রীচাহিদা বিবেচনা করে নিয়মিত রুট, সময়সূচি ও বাসের সংখ্যা পর্যালোচনা করা দরকার। সর্বোপরি, যেসব নারী সাধারণ বাসেই যাতায়াত করতে বাধ্য হন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পিংক বাস শুধু একটি বিশেষ গণপরিবহন নয়; এটি নারীর অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী প্রতীক। কিন্তু সেই উদ্যোগকে অর্থবহ করতে হলে পুরো পরিবহনব্যবস্থাকেই নারীর জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে হবে। নারী যেখানে নিশ্চিন্তে ও সসম্মানে চলাচল করতে পারেন, সেই শহরই সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব। শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের সার্বিক মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমেই নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন উপহার দেওয়া সম্ভব।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী বগুড়া







