এ বঞ্চনার শেষ কোথায়?
- অন্যান্য ক্যাডারে প্রায় প্রতিবছর পদোন্নতি হলেও বিসিএস শিক্ষায় ৫বছরে একবার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ষষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র স্কেল) পদোন্নতির চিত্র গত পাঁচ বছরে মোটামুটি নিয়মিত। ২০২২ সালে ১১৭ জন, ২০২৩ সালে ২৭০ জন, ২০২৪ সালে ২০১ জন এবং ২০২৬ সালে ২৬৪ জন কর্মকর্তা এই গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন। একই সময়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬— এই চার বছরের একটিতেও ষষ্ঠ গ্রেডে কোনো পদোন্নতি হয়নি। কেবল ২০২৫ সালে একবারে ১৮৭০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা প্রকৃতপক্ষে বছরের পর বছর জমে থাকা জটের একলপ্তে নিষ্পত্তি, নিয়মিত প্রশাসনিক ছন্দের প্রতিফলন নয়। একটি ক্যাডারে পদোন্নতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে চলে, আরেকটিতে তা নির্ভর করে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসা বিচ্ছিন্ন এক-একটি সিদ্ধান্তের ওপর। এই ফারাকই প্রমাণ করে, সমস্যার মূল সম্পদের সংকটে নয়, অগ্রাধিকারের বিন্যাসে।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা অন্য যেকোনো ক্যাডারের তুলনায় সর্বোচ্চ। প্রতিটি ব্যাচেই এই ক্যাডারে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা যুক্ত হন, কারণ দেশের সরকারি কলেজগুলোর বিশাল শিক্ষক চাহিদা এই ক্যাডারের মাধ্যমেই পূরণ হয়। ফলে যুক্তিসংগতভাবেই প্রত্যাশা করা যায়, পদোন্নতির সংখ্যাও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নিয়োগে যে ক্যাডার সবচেয়ে বড়, পদোন্নতিতে সেই ক্যাডারই যদি সবচেয়ে ক্ষুদ্র বা অনিয়মিত সংখ্যায় স্বীকৃতি পায়, তাহলে তা কেবল একটি প্রশাসনিক অসংগতি নয়, বরং একটি কাঠামোগত বৈষম্য। প্রশাসন ক্যাডারের তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের বিপরীতে যে বার্ষিক পদোন্নতির ছন্দ বজায় থাকে, শিক্ষা ক্যাডারের বিশাল জনবলের বিপরীতে অন্তত সেই আনুপাতিক ছন্দ থাকা উচিত ছিল। বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো: সবচেয়ে বড় ক্যাডারটিই পদোন্নতির প্রশ্নে সবচেয়ে অবহেলিত। এই আনুপাতিক অসামঞ্জস্য দূর না হলে সংখ্যার হিসাবে যেকোনো একবারের বড় পদোন্নতিও (যেমন ২০২৫ সালের ১৮৭০ জন) প্রকৃত বৈষম্য আড়াল করার একটি ভুল ইঙ্গিত দিতে পারে।
একজন শিক্ষক যখন বছরের পর বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার পদোন্নতি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার পেশাগত স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা, কর্মপ্রেরণা এবং রাষ্ট্রের কাছে তার অবদানের মূল্যায়ন। অথচ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পদোন্নতির প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো শূন্য পদ, কখনো পদসংকট, কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, কখনো আর্থিক সংশ্লেষের প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর মেলে না। যাদের পদোন্নতি প্রাপ্য, তাদের পদোন্নতি আটকে থাকার প্রকৃত কারণটি কী?
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে (২০ জুলাই প্রকাশিত) দেখা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি কলেজগুলোয় কর্মরত দশম গ্রেডের ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে এক লহমায় নবম গ্রেডের বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি ও রীতি ভেঙে নতুনভাবে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত প্রদর্শকদের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন দেওয়ায় এই প্রশ্নটি আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অন্যান্য টায়ারে দুইবার পদোন্নতি দেওয়া হলেও প্রভাষকদের পদোন্নতি হয়েছে মাত্র একবার। ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে জারি করা দুটি পৃথক স্মারকের মাধ্যমে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা এবং বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেড প্রাপ্যতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সভা আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৭ জুলাই সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপতিত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এসব বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অন্তত প্রশাসনিকভাবে পদোন্নতির বিষয়টি একটি দৃশ্যমান প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। যদি বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা করার মতো পর্যায়ে বিষয়টি এগিয়ে থাকে, তাহলে এর আগে এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাষকদের পদোন্নতি আটকে ছিল কেন? আর এখনো যদি তা চূড়ান্ত বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে বাধাটি কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানা দরকার। তার চেয়েও বেশি জানা দরকার রাষ্ট্রের।
শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এলেই পদোন্নতির প্রশ্নটি যেন অকারণে আর্থিক সংশ্লেষের জটিল অঙ্কে আটকে যায়। রাষ্ট্রের কোষাগার সেই ব্যয় বহন করতে পারবে কি না, সেই হিসাবই তখন প্রধান বিবেচনায় পরিণত হয়। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, পদোন্নতি সব সময় অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই। ফলে একজন কর্মকর্তাকে তার প্রাপ্য উচ্চতর পদমর্যাদা দিতে রাষ্ট্রের যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা যদি শূন্য বা নগণ্য হয়, তাহলে সেই পদোন্নতি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার যৌক্তিকতা কোথায়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। পদোন্নতি এবং বেতন বৃদ্ধি এক বিষয় নয়। পদোন্নতি একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও পেশাগত অবস্থানকে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে আর্থিক সুবিধা নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট বেতন কাঠামো ও বিধিবিধানের আলোকে। ফলে আর্থিক সংশ্লেষ নেই এমন পদোন্নতির পথ যেখানে প্রশাসনিকভাবে সম্ভব, সেখানে শুধু অর্থের অজুহাতে পদোন্নতি বিলম্বিত করা ন্যায্য হতে পারে না। পদোন্নতি হলে যদি বেতনই না বাড়ে, তাহলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে নামমাত্র স্বীকৃতি দিতে এত অনীহা কেন? বাস্তবে বহু বছর ধরে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কার্যক্রম শূন্য পদের সীমাবদ্ধতার কারণে স্থবির ছিল। অন্যদিকে একই ব্যাচের প্রশাসন, পুলিশ, কৃষি বা কর ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব ও মর্যাদার উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়েছেন। অথচ বিসিএস সাধারণ শিক্ষার ৩৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা আজ অবধি পদোন্নতিবঞ্চিত। বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, পদোন্নতি না দেওয়ার ফলে শিক্ষা ক্যাডারে এক ধরনের স্থায়ী স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। একজন কর্মকর্তা কর্মজীবনের একটি পর্যায়ে এসে বছরের পর বছর একই পদে আটকে থাকেন। তার অধস্তন ব্যাচের কর্মকর্তাও অনেক সময় একই পদে অবস্থান করেন। ফলে জ্যেষ্ঠতা, দায়িত্ব বণ্টন এবং পেশাগত অগ্রগতির স্বাভাবিক কাঠামো ব্যাহত হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই সময়ে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে তাদের কর্মজীবনের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হন। প্রশাসন, পুলিশ, কর, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্যাডারে পদোন্নতির একটি তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান কাঠামো রয়েছে। ফলে শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা যখন দেখেন তার সমসাময়িক অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তা একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে উচ্চতর দায়িত্বে যাচ্ছেন, অথচ তিনি বছরের পর বছর একই পদে অবস্থান করছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়।
এটি কেবল ব্যক্তিগত হতাশার বিষয় নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ সরকারি কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাদের পাঠদান, পরীক্ষা, একাডেমিক প্রশাসন, কারিকুলাম বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
অথচ তাদের পেশাগত অগ্রগতির পথ যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে যত কথাই বলা হোক, বাস্তব কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা থেকেই যায়।
এখানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই ৯২২ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষা ক্যাডারের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট নিরসনের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। এর মাধ্যমে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল: পদোন্নতির ক্ষেত্রে শূন্য পদ এবং আর্থিক সংশ্লেষের প্রচলিত যুক্তির বাইরে গিয়েও প্রশাসনিক সমাধান সম্ভব।
তাহলে সেই একই যুক্তি নিচের স্তরগুলোর ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হবে না কেন?
বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ৩৮তম ব্যাচসহ যেসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাষক পদে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অপেক্ষা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। একজন কর্মকর্তা যখন নিয়োগের পর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন, পরীক্ষা নেন, প্রশাসনিক কাজ করেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন এবং রাষ্ট্রের শিক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখেন, তখন নির্ধারিত যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা অর্জনের পর তার পদোন্নতি কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি তার প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার ও পেশাগত স্বীকৃতির অংশ।
এই জায়গাটিই আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
পদোন্নতি নিয়ে আলোচনা হলেই যদি প্রথম প্রশ্ন হয়, ‘অতিরিক্ত কত টাকা লাগবে’, তাহলে আমরা পদোন্নতির মূল উদ্দেশ্যটিকেই সংকুচিত করে ফেলি। বরং প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কর্মকর্তাটি কি নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করেছেন?’ যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কোন প্রশাসনিক বা আইনগত কারণে তার পদোন্নতি আটকে আছে?’ এবং সেই কারণটি প্রকাশ্য, নিরীক্ষণযোগ্য ও যুক্তিসংগত হওয়া উচিত।
অদৃশ্য কোনো কারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে পারে না।
একজন শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ শুধু শিক্ষক দিবসে ফুল দেওয়া নয়। শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ তার কর্মজীবনের কাঠামোকে ন্যায়সংগত করা। পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, দায়িত্ব বণ্টন এবং পেশাগত অগ্রগতির সুযোগকে একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
একজন দক্ষ শিক্ষক কেন শিক্ষা ক্যাডারে আসবেন, কেন তিনি দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকবেন, কেন তিনি গবেষণা করবেন, নতুন শিক্ষণপদ্ধতি অনুসরণ করবেন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত শ্রম দেবেন, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু ‘দেশসেবা’ দিয়ে দেওয়া যায় না। দেশসেবা অবশ্যই একটি মহান মূল্যবোধ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে পেশাগত স্বীকৃতি, ন্যায্য পদোন্নতি এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশও নিশ্চিত করতে হয়।
তাই এখন প্রয়োজন আরেকটি সভার নোটিশ নয়, প্রয়োজন একটি স্থায়ী ও কাঠামোগত সমাধান। আর এই সমাধান আসলে সিভিল সার্ভিসের নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। লক্ষণীয়, বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা একই ব্যাচ হিসেবে একই দিনে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই একই বিভাগীয় পরীক্ষা দিতে হয়। পদোন্নতির জন্য সিনিয়র স্কেল অর্জনের ক্ষেত্রেও অভিন্ন পরীক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। অর্থাৎ নিয়োগ থেকে স্থায়ীকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ক্যাডারনির্বিশেষে একটি অভিন্ন, তুলনীয় ও সমান্তরাল কাঠামো ইতিমধ্যে কার্যকর আছে। প্রশ্ন হলো, তাহলে পদোন্নতির চূড়ান্ত ধাপে এসেই কেন এই সমান্তরালতা ভেঙে পড়ে?
যেহেতু নিয়োগ, স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল অর্জনের জন্য অভিন্ন পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে বিদ্যমান, তাই একমাত্র যুক্তিসংগত ও টেকসই সমাধান হলো, সিভিল সার্ভিসের একই ব্যাচের সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একই দিনে পদোন্নতি প্রদানের ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু করা। এটি কোনো নতুন বা অপরিচিত কাঠামো নয়; বরং যে সমান্তরাল প্রক্রিয়া নিয়োগ ও স্থায়ীকরণে ইতিমধ্যে কার্যকর, তারই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। এর ফলে কোনো একটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা একচেটিয়াভাবে অগ্রসর হবেন আর অন্য ক্যাডার বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকবেন, এমন বৈষম্যের সুযোগ কাঠামোগতভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। একই ব্যাচ, একই দিনে নিয়োগ, একই দিনে স্থায়ীকরণ পরীক্ষা, একই দিনে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা—এই ধারাবাহিকতার স্বাভাবিক পরিণতি হওয়া উচিত একই দিনে পদোন্নতি। এর বাইরে আংশিক বা বিচ্ছিন্ন যেকোনো সমাধান সাময়িক প্রশমন দিতে পারে, কিন্তু বৈষম্যের মূল কাঠামোকে অক্ষতই রেখে দেয়।
রাষ্ট্র তার পেশাজীবীদের সঙ্গে কতটা ন্যায়সংগত আচরণ করে, সেটিও সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি তাই কেবল কয়েক হাজার কর্মকর্তার ব্যক্তিগত প্রত্যাশার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের শিক্ষা প্রশাসনের দক্ষতা, সরকারি কলেজগুলোর একাডেমিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষকতা পেশা গড়ে তোলার প্রশ্ন।
২৭ জুলাইয়ের সভা সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের একটি সুযোগ তৈরি করেছিল। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া। যাঁরা বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির যোগ্য, তাদের পদোন্নতি দ্রুত ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি প্রদান করে বঞ্চনার অবসানে ব্রতী হওয়া উচিত। যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা হোক। আর কোনো কর্মকর্তা যেন বছরের পর বছর কোনো অজ্ঞাত কারণে তার প্রাপ্য পদমর্যাদার অপেক্ষায় না থাকেন। অন্যান্য ক্যাডারের ৩৮তম ব্যাচ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতি পাচ্ছেন, অথচ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকেরা পদোন্নতিবঞ্চিত।
বিসিএসের দীর্ঘ প্রাক-নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বাস্তব চাকরিজীবন মিলিয়ে সিভিল সার্ভিসে শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদচারণা প্রায় এক যুগ (১২ বছর) হলেও তাঁরা চরম বৈষম্য ও দীর্ঘস্থায়ী পদোন্নতি জটের শিকার। সমসাময়িক অন্যান্য ক্যাডারের ৩৬তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালে, ৩৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে এবং ৩৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ২০২৬ সালে ষষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র স্কেল) উন্নীত হয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন, অথচ শিক্ষা ক্যাডারের সমসাময়িক ব্যাচের কর্মকর্তারা এখনো পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এতে তাদের পেশাগত অগ্রগতি ও আর্থিক সুবিধা ব্যাহত হচ্ছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতি দেওয়া হলেও প্রকৃত আর্থিক প্রণোদনা অনুপস্থিত। শিক্ষকদের ন্যায্য প্রণোদনা ও মর্যাদা নিশ্চিতে পরিবহনসুবিধা, লাঞ্চ ভাতা ও আবাসন সহায়তা চালু প্রয়োজন।
কারণ পদোন্নতি কোনো দয়া নয়; এটি একজন পেশাজীবীর কর্মজীবনের স্বাভাবিক স্বীকৃতি।
আর যাঁরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন, তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি যদি কোনো অদৃশ্য কারণে আটকে থাকে, তবে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু শিক্ষকদের নয়, রাষ্ট্রের কাছেই ফিরে আসে।
শিক্ষকের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পূর্বশর্ত।
লেখক: শিক্ষক









