মক্কা জোটে যোগ দেওয়া জরুরি নয়

দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্যাক্ট’ শুধু একটি আঞ্চলিক সমঝোতা নয়, বরং বিশ্ব নিরাপত্তাব্যবস্থায় এক নতুন ভূরাজনৈতিক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এ চুক্তির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে স্বাক্ষরকারী দেশ তিনটি ভৌগোলিকভাবে পরস্পরের সীমান্তসংলগ্ন নয়। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভিন্ন তিনটি অঞ্চলের এই তিন রাষ্ট্রের নিজস্ব কিছু ঐতিহাসিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত পটভূমি রয়েছে।
ইসরায়েল ও ইরানের ভূরাজনৈতিক হুমকি মোকাবিলায় সৌদিদের নিরাপত্তা শঙ্কা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান এবং ভারতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মুখোমুখি পাকিস্তান— এ তিন দেশের স্বার্থের জায়গাগুলো একবিন্দুতে এসে মিলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবের বাড়তি উদ্যোগে এ সামরিক জোট দ্রুত রূপ লাভ করেছে।
মূলত সৌদি অর্থসম্পদ, তুরস্কের আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের মাঠপর্যায়ের সামরিক অভিজ্ঞতার এক ত্রিমুখী সমন্বয় ঘটেছে এ জোটে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে এ প্যাক্টের তাৎক্ষণিক ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পাকিস্তান এ সামরিক বলয়ে যুক্ত হওয়ায় ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলে নিরাপত্তাহীনতার বোধ ও সামরিক চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে উদ্ভূত কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে ভারত এখন ইসরায়েলের মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় ও গভীর করতে বাধ্য হবে।
একদিকে পাকিস্তান-তুরস্ক এবং অন্যদিকে ভারত-ইসরায়েল অক্ষ শক্তিশালী হওয়ার ফলে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি তীব্র অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাপী সমরাস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক লবি ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটগুলো এ সুযোগে এই অঞ্চলে নিজেদের বাজার সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক প্রতিযোগিতার পরোক্ষ অথচ মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর।
প্রথমত, বাংলাদেশ একটি সীমিত সম্পদের দেশ। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সামরিক লবিগুলোর প্রভাবে বাংলাদেশের ওপর সামরিক বাজেট ও কেনাকাটা বাড়ানোর এক ধরনের পরোক্ষ উসকানি সৃষ্টি হতে পারে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় একটি অংশ যদি অপ্রয়োজনীয় অস্ত্র সম্ভার ও সামরিকায়নের পেছনে ব্যয় হয়, তবে তা সরাসরি দেশের উন্নয়ন বাজেট ও জনস্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস বা কৃষিক্ষেত্রে সারের সংকটে ভুগছে, তখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অভ্যন্তরীণ এ মৌলিক ঝুঁকিগুলো দূর করা। মিসাইল বা নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্য থেকে মক্কা প্যাক্টে যোগদানের বিষয়ে যেভাবে আগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বলা হচ্ছে, এটি শুধু একটি ‘মুসলিম পারিবারিক জোট’; অথচ এ যুক্তিটি নিতান্তই বিভ্রান্তিকর ও অসংলগ্ন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর হাতে সহধর্মী মুসলিম জনগোষ্ঠীর রক্তের দাগ রয়েছে—যেমন ইয়েমেনিদের ওপর বোমাবর্ষণ, আফগান কিংবা বাঙালিদের ওপর সামরিক নির্যাতন বা কুর্দি সংকট। গাজা গণহত্যা, কাশ্মীর সংকট কিংবা রোহিঙ্গা সংকটের সময় এই তথাকথিত জোটে থাকা রাষ্ট্রগুলোর কার্যকর কোনো সমন্বিত অবস্থান দৃশ্যমান হয়নি। মূলত নিজেদের ব্যর্থতা ও স্বার্থকে ধর্মীয় আবরণে ঢেকে রাখার একটি প্রয়াস এখানে রয়েছে।
সর্বাপেক্ষা গুরুতর বিষয়টি হলো, মক্কা প্যাক্টে কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্যান্য সদস্য দেশ সামরিকভাবে তার পাশে দাঁড়ানোর বাধ্যবাধকতার নীতি রয়েছে। এ শর্তের কারণে বাংলাদেশ যদি এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়, তবে তা দেশকে অন্যের সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত-পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংঘাত, কিংবা সৌদি আরব-ইরান বা তুরস্ক-ইসরায়েল মুখোমুখি হলে বাংলাদেশকে না চাইতেও সেই প্রক্সি ওয়ার বা পরোক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে এবং বাংলাদেশকে একটি প্রক্সি যুদ্ধের ভূগোলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের মূল সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এবং কোনো সামরিক জোটে না জড়ানোর নিরপেক্ষ অবস্থান। সম্প্রতি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের একটি অন্যতম চেতনা ছিল একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি চর্চা করা—যেখানে বাংলাদেশ কোনো বিশেষ অক্ষ বা পরাশক্তির দিকে হেলে পড়বে না। কোনো ভূরাজনৈতিক অক্ষের প্ররোচনায় মক্কা জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশ অন্য দেশের আঞ্চলিক বিবাদগুলোকে গায়ে পড়ে নিজের কাঁধে তুলে নেবে। দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে বিভিন্ন বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রক্ষা করা ইতিবাচক হলেও কোনো বহুপক্ষীয় সামরিক জোটে গিয়ে নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে ঝুঁকিতে ফেলা একেবারেই অনুচিত। বাংলাদেশকে অবশ্যই এ জাতীয় যেকোনো সামরিক উসকানি ও জোটে যোগদান থেকে শতভাগ সতর্ক ও দূরে থাকতে হবে, যাতে দেশের শান্তি ও উন্নয়ন ব্যাহত না হয়।
লেখক: গবেষক, দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি বিশ্লেষক







