নেপালের বন্যা কি বড় বিপদের সংকেত?

তিব্বতের শিগাতসে প্রদেশের জিরং কাউন্টিতে ভূমিধসের পর দমকলকর্মীরা একটি নদী বরাবর অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন- রয়টার্স
হিমালয়ের পাহাড়ে বরফ জমে আছে, আর সেই বরফই ধরে রেখেছে বিশাল বিশাল শিলাস্তর ও পাহাড়ের ঢাল। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় সেই প্রাকৃতিক বন্ধন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা এবার সেই বিপদেরই এক নির্মম উদাহরণ সামনে এনেছে। হিমবাহ ধসে নেমে আসা কাদা, পানি ও বরফের স্রোতে মুহূর্তেই ভেসে গেছে জনপদ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি এখন ক্রমেই বাড়ছে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী জনপদগুলোতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানার পর জলবায়ু সংকট কীভাবে পাহাড় ও মেরু অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর ফলে লাখো মানুষের জীবন হুমকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় একটি হিমবাহ ধসে পড়াই বুধবার ভোতে কোসি নদী দিয়ে নেমে আসা কাদা, পানি ও বরফের ভয়াবহ স্রোতের প্রধান কারণ। ওই স্রোতে ভবন ও সড়ক ভেসে গেছে। অন্তত ৩৬০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
প্রথমে এই হিমবাহ ধসের জন্য ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পকে দায়ী করা হয়েছিল। তবে এখন ধারণা করা হচ্ছে, ৭ হাজার মিটার উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে বরফের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ার কারণেই এটি ঘটেছে। ওই ধসের আঘাতে ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ‘দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গের অতিরিক্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূকম্পন শক্তি আসলে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল।’
হিমালয়ের এই দুর্যোগ ঠিক কীভাবে ঘটল, তা বিজ্ঞানীরা এখনো খতিয়ে দেখছেন। তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লা পোড়ানোর কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। এর ফলে হিমবাহ ও ভূ-চিরস্থায়ী তুষারস্তর বা পারমাফ্রস্ট দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে অনেক বিজ্ঞানী সতর্ক করছেন।
হিমবাহের দেয়ালের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সময় ওই অঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ছিল। এতে ভাঙা শিলাস্তরকে একসঙ্গে ধরে রাখা বরফ গলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের হিমবিজ্ঞানী ড. হ্যামিশ প্রিচার্ডের দলের স্থাপন করা সেন্সর ওই স্থান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ছিল। তার তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধসের দুই দিন আগে ভূমির তাপমাত্রা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
তিনি বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারকে বলছিলেন, ‘এই উচ্চ তাপমাত্রা তুষারের স্তরকে দুর্বল করে ফেলেছিল, বরফের ফাটলগুলো পানিতে পূর্ণ করে দিয়েছিল এবং হিমবাহকে ধরে রাখা বরফ ও পাথরের মধ্যকার বন্ধন গলিয়ে দিয়েছিল।’
চলতি বছরের শুরু থেকে ওই অঞ্চলে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় ছিল বর্ষাকাল। এতে মাটি পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে এবং নদীগুলোর পানিও বেড়ে যায়।
এ ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের শীর্ষ বৈজ্ঞানিক পরামর্শদাতা সংস্থা সতর্ক করেছিল, পারমাফ্রস্টে ঢাকা তুন্দ্রা থেকে শুরু করে পাহাড়ি হিমবাহ পর্যন্ত আগে বরফে আবদ্ধ ভূমিগুলো তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের ষষ্ঠ সংশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপ ক্রায়োস্ফিয়ার অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়াবে এবং আরও তীব্র করবে।’ সংস্থাটি আরও বলেছিল, ‘হিমবাহ সরে যাওয়া ও তুষার কমে যাওয়ার কারণে বন্যা, ভূমিধস এবং মিঠাপানির সংকট বিশ্বের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।’
বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। আল্পাইন ও মেরু অঞ্চলে উষ্ণতা আরও দ্রুত বাড়ছে। কারণ তুষার ও বরফ হারিয়ে যাওয়ায় ভূমির ওপরের প্রাকৃতিক তাপরোধী স্তর কমে যাচ্ছে।
কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত ভূগোলের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. রিচার্ড ওয়ালার বললেন, ‘তুষার ও হিমবাহের বরফ ক্রমে হারিয়ে যাওয়ায় ভূমির পৃষ্ঠ কম আলো প্রতিফলিত করে। ফলে এটি আরও বেশি সৌরশক্তি শোষণ করে এবং উত্তপ্ত হয়। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার সঙ্গে মিলে এই প্রক্রিয়া পাহাড়ের পারমাফ্রস্ট গলিয়ে দিচ্ছে।
‘উঁচু পাহাড়গুলোকে এভাবে ভাবুন—ভাঙা শিলাস্তরের জোড়াগুলো বরফ দিয়ে আটকে রাখা আছে। পারমাফ্রস্ট ও বরফে ভরা এসব জোড় গলে গেলে এ ধরনের ভয়াবহ ধসের সম্ভাবনা তৈরি হয়’, বলছিলেন তিনি।
গলনপ্রক্রিয়া ভূমির আকৃতি, রং ও দৃঢ়তা বদলে দিচ্ছে। এতে হিমবাহের গলিত পানির হ্রদ তৈরি হচ্ছে বা পুরনো হ্রদগুলো আরও বড় হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে অনেক নদীর উৎস এবং ভাটির জনপদের পানীয় জলের সরবরাহও হুমকিতে পড়তে পারে। এশিয়ার অনেক অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো হিমবাহ থেকে নেমে আসা নদীর ওপর নির্ভরশীল।
মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিই হিমবাহ সরে যাওয়ার কারণ, এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট নিশ্চিত। এর ফলে আল্পস থেকে আন্দিজ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ধসে পড়েছে। নেপালের লাংটাং অববাহিকায় ১৯৬৪ সালের পর হিমবাহ হারানোর হার চার গুণেরও বেশি বেড়েছে বলে একটি গবেষণায় দেখা গেছে।
এ কারণে একাধিকবার প্রাণহানিও ঘটেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভোতে কোসি নদীতে একটি তুলনামূলক ছোট বন্যা হয়েছিল। আর ২০১৫ সালে ভূমিকম্পের কারণে লাংটাং লিরুং পর্বতে তুষারধস নেমে ধ্বংস হয়েছিল লাংটাং গ্রাম।
জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো যখন মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছে এবং মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বেঁচে যাওয়া মানুষদের সহায়তায় প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন অন্যরা ভাবছেন—পরবর্তী বিপর্যয় কোথায় ঘটতে পারে।
ওয়ালার জানান, হিমবাহ ও পারমাফ্রস্ট থাকা যেকোনো উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে। এর মধ্যে ইউরোপের আল্পস, ককেশাস, হিমালয়, আন্দিজসহ আরও অনেক অঞ্চল রয়েছে।
হিমবাহের দুর্বল হয়ে পড়ার গতি বাড়তে থাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রিচার্ড।
তিনি বললেন, ‘আরও তুষারধস ও আরও বন্যা অনিবার্য, বিশেষ করে সরে যেতে থাকা হিমবাহের সামনে হ্রদগুলো বড় হতে থাকায়। এসব উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষকে সুরক্ষা দিতে জরুরি ভিত্তিতে আগাম সতর্কতাব্যবস্থা প্রয়োজন।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান










