চীনা যুদ্ধবিমান কেনার পদক্ষেপ প্রশংসনীয়

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. নাঈম আশফাক চৌধুরী
চীন থেকে অত্যাধুনিক জে-১০সি (J-10C) যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তকে শুধু একটি সামরিক সরঞ্জাম বা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রাক্কলনের বিচ্ছিন্ন খণ্ডচিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেখতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিরোধ (মিলিটারি ডেটারেন্স) শক্তিশালীকরণের একটি গভীর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে। জাতীয় নিরাপত্তা একটি বহুমুখী ও ব্যাপক বিস্তৃত ধারণা। জাতীয় নিরাপত্তা বলতে শুধু ভূখণ্ডের ভৌত সুরক্ষা কিংবা বাহিনীর আকার বা সামরিক সরঞ্জামকে বোঝায় না। এর পরিধির মধ্যে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য। তবে এই সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হলো সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একটি রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক, সামাজিক ও ভূকৌশলগত দরকষাকষির পেছনে তার সামরিক ক্ষমতার উপস্থিতি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর যেকোনো আন্তর্জাতিক অবস্থানের পেছনে তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পাশাপাশি অপ্রতিরোধ্য সামরিক ক্ষমতার প্রভাব বিদ্যমান থাকে বলেই বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের সিদ্ধান্ত মেনে চলার এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এমনকি বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রকেও প্রতিপক্ষ অত্যন্ত সমীহ করে চলে তাদের শক্তিশালী সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতার কারণে। যখন একটি রাষ্ট্র ন্যূনতম হলেও একটি দৃশ্যমান ও প্রভাববিস্তারকারী সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, কূটনৈতিক আলোচনায় কিংবা জাতিসংঘসহ যেকোনো বহুপক্ষীয় সংস্থায় তার দরকষাকষির ক্ষমতা বা লিভারেজ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ইরানের সামরিক কৌশলের দিকে তাকালে এ বাস্তবতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ দৃশ্যমান হয়। কয়েক দশক ধরে তীব্র বৈরী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্বের শীর্ষ সামরিক পরাশক্তির সরাসরি হুমকি সত্ত্বেও ইরান শুধু টিকেই থাকেনি, বরং যেকোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলে একটি নির্ধারক ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট সামরিক কৌশল এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার ফসল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের লক্ষ্য রাতারাতি একটি বৈশ্বিক পরাশক্তিতে রূপ নেওয়া নয় এবং তা আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্ভবও নয়। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তাকে টেকসই ও কার্যকর করতে হলে আমাদের এমন কিছু কৌশলগত সামরিক প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা সম্ভাব্য যেকোনো বৈরী প্রতিপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক ছকে প্রভাব ফেলবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে দরকষাকষির সুযোগ দেবে।
অনেকে পেশাদারি বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে সহজ সমীকরণে দাবি করেন যে, আধুনিক যুদ্ধে কয়েক ঘণ্টা বা দু-এক দিনের মধ্যেই বিমানঘাঁটি কিংবা রানওয়ে অকার্যকর হয়ে যাবে। এ জাতীয় বক্তব্য শুধু অদূরদর্শীই নয়— আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আধুনিক কৌশল বোঝার ক্ষেত্রেও অপরিপক্ব। সামরিকভাবে টিকে থাকা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে সক্ষমতা প্রদর্শন শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট ভৌত উপকরণের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে একটি সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, ভূপ্রকৃতি এবং সুসংহত জাতীয় ঐক্যের ওপর। ইরানের ক্ষেত্রে তারা জানত যে বিমান হামলা বা প্রযুক্তির তীব্রতায় সমতল ভূমিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন। ফলে তারা মাটির ও পানির নিচে সম্পূর্ণ নতুন সামরিক অবকাঠামো এবং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা গ্রহণ করেছে বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা বা মোজাইক স্ট্র্যাটেজি। অর্থাৎ নিজেদের ওপর নেমে আসা সম্ভাব্য হুমকির ধরন বিশ্লেষণ করে তারা সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড বা নিজস্ব উপযোগী প্রতিরোধ কৌশল গড়ে তুলেছে।
আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ আত্মোপলব্ধি ও নিজস্ব উপযোগী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন থেকে জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনা আমাদের বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন ও আকাশ প্রতিরক্ষার সামর্থ্য বৃদ্ধিতে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুধু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আধুনিক অস্ত্র কিনলেই প্রতিরক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দেশীয় সক্ষমতার স্বাবলম্বীকরণ বা ইন্ডিজেনাইজেশনের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। আমাদের দেশের নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সম্পদ রয়েছে। যেমন আমাদের বিশাল জনসংখ্যা এবং প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের একই জাতিগত ও ভাষাগত পরিচয়, যা বিশ্বের বহু দেশের নেই। এ ধরনের সামাজিক একজাতীয়তা বা হোমোজেনিটিকে প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। একই সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানার বিপরীতে থাকা সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির উৎসগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
যেকোনো আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিল শুধু সামরিক টেবিল নয়; এটি অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ভূকৌশলগত স্বার্থরক্ষার টেবিল। প্রতিপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষির সময় আপনার সামরিক প্রতিরক্ষা অবকাঠামো যদি নড়বড়ে হয়, তবে তাদের বক্তব্যের সুর ও শর্ত আরোপের ধরন হবে একরকম। কিন্তু আপনার হাতে যদি ন্যূনতম অথচ সুনির্দিষ্ট ও পাল্টা আঘাত হানার মতো আধুনিক প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্ম থাকে, তখন আলোচনা টেবিলে প্রতিপক্ষের সুর ও আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন আসে। সেদিক থেকে চীনা যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পদক্ষেপটি কৌশলগতভাবে প্রশংসনীয়। তবে এটিকে চূড়ান্ত গন্তব্য না ভেবে প্রগতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত স্বাবলম্বিতা বাড়ানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। শুধু তখনই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব ও সর্বাঙ্গীণ জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত ও সংরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল







