ছিনতাই স্পট ৩০০
রাতে-ভোরে নিরাপদ নয় ঢাকা
- রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ১,৩৮৭
- হটস্পট ৫৫
- ২০২৬-এ প্রথম ছয় মাসে ১৭২ মামলা, গ্রেপ্তার ৪০২
- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্যাট্রল টিম বাড়ানো হয়েছে: ডিএমপি

ছবি: এআই
ভোরের ঢাকা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ফাঁকা রাস্তা, কম যানবাহন— চারপাশে দিনের শুরু হওয়ার অপেক্ষা। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার কাছে চলন্ত রিকশার পাশাপাশি চলতে শুরু করে একটি মোটরসাইকেল। পেছনে থাকা ছিনতাইকারী ঝাঁপিয়ে পড়ে রিকশা যাত্রীর হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগে; এক হ্যাঁচকা টান। ভারসাম্য হারিয়ে রিকশা থেকে ছিটকে সড়কে পড়েন ওই যাত্রী।
স্বামীর চোখের সামনে মাথা ফেটে রক্তে ভিজে যায় রাস্তা। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চোখের চিকিৎসা করাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় আসা স্কুলশিক্ষক রনজিলা পারভীনের জীবন কেড়ে নিল সেই ঢাকা।
গত শনিবার ভোরের এ ঘটনা যেন রাজধানীর বর্তমান নিরাপত্তাহীনতার এক ভয়ংকর প্রতীক। একই দিন ভোরে শ্যামপুরের বরইতলায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন জনি নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। এর দুদিন আগে, ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার পথে যাত্রাবাড়ী মোড়ে এক নারীর কান থেকে দুল ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারী। রাজধানীর পথে বের হওয়া মানুষ এখন যেন জানেন না— পরের মোড়ে অপেক্ষা করছে কে, ছিনতাইকারী নাকি মৃত্যু। যদিও পুলিশ বলছে, কিছু ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় ছিনতাই বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের পরিসংখ্যানে তা বাড়েনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকায় ছিনতাই এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এটি সংঘবদ্ধ নগর সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। ছুরি, ব্লেড, চাপাতি, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মোটরসাইকেলে কিংবা দলবদ্ধভাবে সক্রিয় এসব চক্র। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা ছিনিয়ে নিচ্ছে মোবাইল, টাকা, ব্যাগ ও স্বর্ণালংকার। বাধা দিলেই হামলা। কখনো সেই হামলার শেষ পরিণতি মৃত্যু।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে ১ হাজার ৩৮৭ জন। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তালিকার বাইরেও হাজারো ছিনতাইকারী সক্রিয়। তাদের একটি বড় অংশ ভাসমান ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই তারা পথচারী, রিকশা, বাস কিংবা প্রাইভেট কারে থাকা মানুষের ওপর হামলে পড়ে।
ডিএমপির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রায় ৩০০ ছিনতাই স্পট রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও রেহাই পাচ্ছেন না। গত জুনে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় অটোরিকশা ছিনতাই করে পালানোর সময় তিন দুর্বৃত্তকে আটক করতে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ঘটনায় উঠে এসেছে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া চিত্র। গত ২৪ আগস্ট কমলাপুরে বাস থেকে নামার সময় চ্যানেল নাইনের ব্রডকাস্ট কর্মকর্তা ফরিদ হোসেনের মানিব্যাগ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এক যুবক। হাতেনাতে ধরা পড়লেও ফরিদের দাবি, সেখানে আরও কয়েকজন ছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, উল্টো তাকেই ছিনতাইকারী প্রমাণ করার চেষ্টা চলছিল।
এর আগে কমলাপুরে এক নারীর কান থেকে দুল ছিনিয়ে পালানোর সময় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে এক ছিনতাইকারী। পুলিশের ভাষ্য, ধরা পড়ার পর সে দুলটি গিলে ফেলে। মিরপুরে এক নারীর ব্যাগ ও মোবাইল নিয়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে আরেকজন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীর গলা থেকে চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে দিনের আলোতেই। বারবার হ্যাঁচকা টানে গলায় আঘাত পান ওই শিক্ষার্থী।
ডিএমপির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৭০৩টি মামলা করা হয়েছে। এ সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ জনকে। শুধু ২০২৫ সালেই ৫৩১ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ৪৩৫ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৭২ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে আরও ৪০২ জন।
কিন্তু এত গ্রেপ্তারের পরও কেন থামছে না ছিনতাই? পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারের পর অনেক অপরাধী দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আবার ভুক্তভোগীদের অনেকেই মামলা করতে চান না। ফলে অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে ফিরে আসে পুরনো চক্রে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অপরাধের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে মাদকের সহজলভ্যতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলছেন, শুধু পেটের দায়ে মানুষ ছিনতাইয়ে নামে না; মাদকের অর্থ জোগাড় করতেও একটি বড় অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
তার ভাষায়, বিচ্ছিন্নভাবে মামলা বা দু-একজনকে গ্রেপ্তার করে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধের মূল উৎসে আঘাত করতে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম অবশ্য বলছেন, ছিনতাইকারীদের ধরতে নিয়মিত বিশেষ অভিযান চলছে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় পুলিশের টহলও বাড়ানো হয়েছে। তার দাবি, কিছু ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় ছিনতাই বেড়েছে বলে মনে হলেও পুলিশের পরিসংখ্যানে তা বাড়েনি।











