কমলের বিনা বেতনের পাঠশালা

পাঠশালায় শিশুদের পড়াচ্ছেন কমল চন্দ্র সরকার- আগামীর সময়
দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম চৌপুকুরিয়া। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি। বাসিন্দাদের অধিকাংশই সাঁওতাল সম্প্রদায়ের। পড়ালেখায় বেশ পিছিয়ে এ গ্রামের ছেলেমেয়েরা।
গ্রামের এক যুবক পিছিয়ে পড়া এসব ছেলেমেয়ের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি কমল চন্দ্র সরকার (৩৭)। পেশায় একজন আনসার সদস্য। জেলার বিরল উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের চৌপুকুরিয়ায় তার বাড়ি। ২০২৩ সালে তিনি বাড়ির আঙিনায় চালু করেন পাঠশালা।
সম্প্রতি কমলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আঙিনায় ছোট একটি ঘর। মেঝেতে চট বিছানো। গোধূলি বেলায় ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকছে খুদে শিক্ষার্থীরা। একজন-দুজন করে আসতে আসতে মুহূর্তেই উপস্থিত ৪০ শিশু। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে তারা। কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজির হলেন কমল। শুরু হলো ক্লাসভেদে পাঠদান।
প্রতিদিন খুদে শিক্ষার্থীদের এভাবে বিনামূল্যে পাঠদান করে চলেছেন তিনি। গ্রামে বসবাসকারী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শিশুদের পাশাপাশি অন্য শিশুদের মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কমলের বাড়িটি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘কমল দাদার পাঠশালা’ হিসেবে পরিচিত। পাঠশালায় বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে থাকতে হয় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।
উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ২০১২ সালে আনসারে যোগ দেন কমল। পাশাপাশি করেন কৃষিকাজ। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা, বাল্যবিয়ে রোধে সচেতনতা তৈরি, পরিবেশ রক্ষায় তালগাছ রোপণ এবং এলাকার মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
পাঠশালার নিয়মিত ছাত্রী পঞ্চম শ্রেণির দীপা বেসরা বলল, ‘প্রতিদিন বিকালে দাদার এখানে আসি। দাদা চমৎকার পড়ান। স্কুলের পড়াগুলো এখানে করে নিই। মাঝেমধ্যে দাদা খেতেও দেন।’
শুধু সামাজিক কর্মকাণ্ডই নয়; পেশাগত জীবনেও কর্তব্যপরায়ণ কমল চন্দ্র সরকার। দৃষ্টান্তমূলক কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্বশীলতার প্রশংসনীয় অবদান ও কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি চলতি বছরের ২০ মে প্রেসিডেন্ট আনসার (সেবা) পদক পেয়েছেন।
কমল আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘২০২৩ সালে পাঁচ শিশুকে নিয়ে আমি এই পাঠশালা শুরু করি। প্রথম দিকে শিশুরা আসতে অনীহা দেখালেও এখন আমার বাড়ির আঙিনাভর্তি শিক্ষার্থী। নিয়মিত ৩০-৪০টি শিশু পড়তে আসে। পড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের বই-খাতা, কলম কিনে দিই। আর মাঝেমধ্যে খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে।’
‘মাঝেমধ্যে কাজ শেষে বাড়িতে ফিরতে দেরি হলে আমার স্ত্রী লতা রানী শিশুদের পড়ান’ যোগ করেন তিনি।
কমলের স্ত্রী লতা রানীর বললেন, ‘আনসারের দায়িত্ব পালন শেষে কমল ওই পোশাকেই সন্ধ্যার আগে শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। আমিও তাকে সহযোগিতা করি। আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে এটি চালিয়ে যেতে চাই।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য জগদীশ চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে সাঁওতাল পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছেন কমল। এ কারণে শিশুরা স্কুলমুখী হয়েছে। তার কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ খুশি। এ ছাড়া ইউনিয়ন আনসার কমান্ডার হওয়ার সুবাদে কমল পুরো ইউনিয়নে ঘোরাফেরা করেন, মাদক ও বাল্যবিয়ে রোধে মানুষকে সচেতন করেন।
বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল ইসলাম বললেন, ‘সম্প্রতি আমি কমল চন্দ্রের পাঠশালা দেখতে তার বাড়িতে যাই। তিনি পরম যত্নে পিছিয়ে পড়া শিশুদের বিনা বেতন পড়াচ্ছেন, যা খুবই ইতিবাচক। আমি তার পাঠশালার জন্য কিছুটা সহযোগিতা করেছি।’







