গুম প্রতিরোধ আইনের ভয়ংকর দিক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রোববার আরেকটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে গেল। সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা অমান্য করে প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী দলের সদস্যরা রোববার জাতীয় সংসদের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ পুনর্বহাল করা হোক।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশ চলাকালে সংসদের অধিবেশন চলছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন আইন অনুযায়ী সংসদ চলাকালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ আশপাশের এলাকায় কোনো ধরনের সমাবেশ, সভা, বিক্ষোভ করা আইনত দণ্ডনীয়। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
কিন্তু সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকার পরও হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে সংসদের সামনে বিক্ষোভ করা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ নয়।
এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ১১-দলীয় জোট প্রমাণ করল, সংসদ নয়; রাজপথে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটিয়েই রাজনৈতিক দাবি আদায় করা হবে। এটি তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিপরীত পদক্ষেপ।
বর্তমান বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটির বৈধতা দেয়নি। এর কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একই শিরোনামে নতুন একটি বিল সংসদে উত্থাপন করেছেন, যা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সংসদে পাস হবে।
গুমের ব্যাপারে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের একটি শক্ত অবস্থান আছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। গুম কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। জামায়াত থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমানকে আওয়ামী লীগ আমলে অন্যায়ভাবে বছরের পর বছর গুম করে আটকে রাখা হয়েছিল। গুম করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ভারতের শিলংয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
এমন সব অনেক গুমের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে গুমবিরোধী একটি জাতীয় ঐকমত্য হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এমনকি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারাও বর্তমানে স্বীকার করেন, তাদের সরকারের আমলে হওয়া গুম মেনে নেওয়া যায় না।
গুম বন্ধ করতে গিয়ে যেন আমরা সমাজে গুম ও হানাহানিকে আইনের মাধ্যমে উৎসাহ না দিই
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে একটি বিপজ্জনক ধারা সংযোজন করা হয়েছিল। নতুনভাবে প্রস্তুত করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এর মধ্যেও সেই বিধানটি রয়েছে, যা সমাজের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, ধারাটি সংযোজনের উদ্দেশ্য মহত হতে পারে এবং জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখেই হয়তো তা করা হয়েছে। কিন্তু উদ্দেশ্য মহত হলেও অনেক সময় তার সুযোগে অসৎ চর্চার সুযোগ অবারিত হতে পারে।
অধ্যাদেশের ২৩ ধারায় এবং সংসদে উত্থাপিত বিলের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী/ স্ত্রী অথবা তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ অথবা অন্য কোনো যৌক্তিক ব্যয় নির্বাহের জন্য গুম হওয়া ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবেন আদালত। এবং আদালত সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে অন্য যেকোনো প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারবেন। এ ছাড়া একই ধারার উপধারা (৩)-এ বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তি অন্যূন পাঁচ বছর ধরে গুম হয়ে থাকলে এবং জীবিত ফিরে না এলে বৈধ উত্তরাধিকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারগণের মধ্যে বণ্টন করার আদেশ দিতে পারবেন আদালত।
আপাতদৃষ্টিতে ধারাটি খুব ভালো মনে হলেও এভাবে বিলটি পাস হলে সমাজে আরেক দফা সহিংসতা ও হানাহানি সৃষ্টি হবে এবং গুমের ঘটনা বৃদ্ধি পেতে পারে। আইন যারা প্রস্তুত করেছেন, তারা এই বিষয়টি চিন্তা করেছেন কি না, তা বলা মুশকিল। একটু ব্যাখ্যা করলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
গুম প্রতিরোধ আইনের উপরিউক্ত বিধান সমাজে ধনী, শিল্পপতি, প্রচুর সম্পত্তির মালিকদের জীবনে হুমকি সৃষ্টি করবে। সেই হুমকি আসতে পারে নিজের পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকেই। কোনো শিল্পপতির কয়েক সন্তানের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর, তিনি তার বাবা অথবা মাকে অচেনা জায়গায় আটক রেখে গুমের নাটক সাজাবেন। পাঁচ বছর পর আদালতে আবেদন করে সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেবেন। এমনও হতে পারে যে, বাবা-মাকে আটক রেখে অন্য উত্তরাধিকারদের হত্যা, ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্পত্তি নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা চলবে।
আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করে গুমের নাটক সাজিয়ে তার উত্তরাধিকারগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চলবে।
সবচেয়ে বেশি হুমকিতে পড়বেন ধনী ব্যক্তিরা, যাদের কোনো ছেলেসন্তান নেই। মুসলিম আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ছেলে না থাকলে তার মৃত্যুর পর সহোদর ভাইয়ের সন্তানরা তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হোন। হতে পারে, তার ভাইয়ের কোনো সন্তান চক্রান্ত ও অপরাধের মাধ্যমে তাকে হত্যা করে অথবা আটকে রেখে গুমের নাটক সাজাবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পদের ভাগ নেবেন।
আমার জানামতে, দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া এক ডাক্তারের তিন মেয়ে। কোনো পুত্রসন্তান নেই। প্রচুর সম্পত্তির মালিক সেই চিকিৎসক হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলে কয়েক দিন পর তার ভাইয়ের স্বল্পশিক্ষিত ছেলেরা দিনাজপুর থেকে এসে তার স্ত্রী ও কন্যাদের কাছে জানতে চান, তাদের ধানমন্ডির কোন ফ্ল্যাট দেওয়া হচ্ছে। চাচার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির ভাগ নিতে চলে এসেছেন। আমাদের সমাজের এই অবস্থা।
এ অবস্থায় গুম প্রতিরোধ আইনে ২৯ ধারা বজায় থাকলে সেটি সমাজে এক মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে। তাই গুম বন্ধ করতে গিয়ে যেন আমরা সমাজে গুম ও হানাহানিকে আইনের মাধ্যমে উৎসাহ না দিই। যেমনটি করা হয়েছিল দখলিস্বত্বের ভিত্তিতে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত আইনি বিধানের মাধ্যমে।
লেখক: সাংবাদিক







