কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে না এলে খোঁজ নিতেন সেই শিক্ষিকা
- সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে শিক্ষিকার মৃত্যু

রনজিলা পারভীন ১৯৯১ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর হয়েছেন প্রধান শিক্ষক। আগামী বছরই তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। নব্বইয়ের দশক থেকেই তাকে দেখছেন গ্রামবাসী। সবার সঙ্গে তার ছিল সখ্য। বিদ্যালয়ের প্রতি রনজিলা ছিলেন দায়িত্বশীল। কোনো শিক্ষার্থী এক দিন ক্লাসে না এলে তার বাড়িতে খোঁজ নিতেও যেতেন তিনি।
৩৫ বছরের শিক্ষক জীবনে শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন মমতায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয়। সেই শিক্ষকই গত শনিবার ঢাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল রবিবার তার মরদেহ যখন প্রিয় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আনা হয়, শেষবারের মতো দেখতে ছুটে আসেন সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও গ্রামের মানুষ।
নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, বেশ কিছু দিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন রনজিলা পারভীন। এজন্য শুক্রবার রাতে স্বামী মতিউর রহমান মতিনের সঙ্গে যান ঢাকায়। গত শনিবার রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসক দেখিয়ে সেদিনই বাড়ি ফেরার কথা ছিল। সকালে রিকশায় যাচ্ছিলেন হাসপাতালে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে আসতেই পেছন থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয় একটি মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা। এ সময় অটোরিকশা থেকে পড়ে তার মাথায় আঘাত লাগে। পরে তার স্বামী সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর খবরে প্রতিবেশী থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের আশপাশের সবাই মর্মাহত হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী বাগবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনা হয় রনজিলার মরদেহ।
সীমা নামে স্থানীয় এক নারী বললেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষার্থী ছিলাম আমি। তারপর আমার দুই মেয়ে এই প্রাথমিকে পড়ালেখা করেছে। রনজিলা আপা তাদের শিক্ষক ছিলেন। এ রকম একটা মানুষের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটল...’— কান্নার কারণে আর কথাই বলতে পারেননি সীমা।
প্রধান শিক্ষকের অকালমৃত্যুতে শোকে মুহ্য তার শিক্ষার্থীরাও। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়মের ভাষায়, ‘ম্যাডাম আমাদের খুব ভালোবাসতেন। আমরা যদি স্কুলে না যেতাম, তাহলে বাড়িতে ফোন করতেন। না হলে বাড়িতে চলে যেতেন। পড়া না পারলে বুঝিয়ে দিতেন।’
এ ঘটনার বিচার চেয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দুলাল সরকার। তার আশা, এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে। যাতে আর কারও পরিবারে এমন ঘটনা না ঘটে।
রনজিলা পারভীনের স্বামী মতিউর রহমান নিউ মার্কেটে ব্যবসা করেন। তাদের সংসারে একটিই মেয়ে রাইসা আক্তার। সে শহরের ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাকে হারিয়ে কথাও হারিয়ে ফেলেছে সে।
এ ঘটনায় ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছেন রনজিলার স্বামী মতিউর রহমান। বাগবাড়ী বালিকা বিদ্যালয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাড়ির পেছনে। এজন্য তার কাছে মতিউর রহমানের আবেদন, ‘আর কোনো শিক্ষকের যেন এভাবে অকালে রাস্তায় প্রাণ দিতে না হয়। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যেন দেওয়া হয়।’
দুপুরে বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় রনজিলার জানাজা। এরপর নেওয়া হয় উপজেলার দাঁড়াইল বাজার গ্রামের বাড়িতে। সেখানে বিকালে আরেকটি জানাজা শেষে দাফন করা হয়।







