বাকিতে খাদ্য কিনছে ৬৭ শতাংশ কৃষি পরিবার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জরুরি কৃষি সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবার। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ৫০ লাখ। সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারের ৮৪ শতাংশ পড়েছে অর্থনৈতিক সংকটে। ৬৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের বাকিতে খাদ্য কিনতে হয়েছে। ৬৬ শতাংশ পরিবার ব্যয় কমিয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। আর ৩০ শতাংশ পরিবার ব্যয় কমিয়েছে কৃষি উপকরণে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জরুরি পরিস্থিতিতে কৃষি সহায়তা পর্যবেক্ষণবিষয়ক প্রতিবেদনে (ডিআইইএম-মনিটরিং) উঠে এসেছে এসব তথ্য। সংস্থাটির জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের নভেম্বরের পর্যবেক্ষণের তুলনায় জরুরি কৃষি সহায়তা প্রয়োজন— এমন পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ। চলতি বছরের জুন থেকে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত এসব পরিবারের কৃষি সহায়তা প্রয়োজন হবে।
২০ এপ্রিল থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের আয়, উৎপাদন, ফসল বিক্রি, খাদ্যাভ্যাস, কৃষিকাজ ও বিভিন্ন অভিঘাতের তথ্য নেওয়া হয়। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য সহায়তার প্রয়োজন সম্পর্কেও পরিবারগুলোর মতামত নেওয়া হয়। এফএও বলছে, বর্ষা মৌসুম তীব্র হওয়া; বন্যা, আয় কমে যাওয়া, খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং কৃষি উপকরণ সংকটে এসব পরিবার চাষাবাদ চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়েছে।
সিলেট ও রংপুরে হার বেশি
জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন কৃষি পরিবারের হার সবচেয়ে বেশি সিলেটে— ৭ শতাংশ। রংপুরে এ হার ৬ শতাংশ। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ৫ শতাংশ করে। ঢাকা ও খুলনায় ৪ শতাংশ এবং বরিশালে ২ শতাংশ। তবে সহায়তার দরকার পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে— ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪০৮। রংপুরে এ সংখ্যা ১ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯ এবং রাজশাহীতে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৭৫। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ১ লাখ ১২ হাজার
এফএওর তথ্যের সূত্র ধরে আগামীর সময় কথা বলেছে সুনামগঞ্জের হাওরে এ বছর ফসলডুবিতে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তাদের একজন শাল্লা উপজেলার বাহারা গ্রামের কৃষক গিরিশ চন্দ দাস তার ৩ একর জমির ধান উৎপাদন নিয়ে বলছিলেন, ‘রোদ না হওয়ার কারণে আমাদের ধান সব গজাইয়া, কালা হইয়া নষ্ট হইয়া গেছে। মোটামুটি ৮০ পারসেন্ট ক্ষতি, ২০ পারসেন্ট পাইছি আরকি। সরকারের তো আমাদের দিকে নজর নাই।’ তার ভাষ্য, শ্রমের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর শতকরা
ক্ষুদ্র কৃষকের চাপ
সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারগুলোর ৫৭ শতাংশ ১ হেক্টরের (প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা) কম জমিতে চাষ করে। দেশের সব কৃষিনির্ভর পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৩৫ শতাংশ। এসব পরিবারের ৬০ শতাংশ আর্থিকভাবে সবচেয়ে কম সচ্ছল এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে রয়েছে। দেশের সব কৃষিনির্ভর পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৩৩ শতাংশ। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস ফসল, গবাদি পশু বা মৎস্য উৎপাদন। অধিকাংশ পরিবার দিনমজুরি, কৃষিশ্রম ও অকৃষি খাতের অস্থায়ী কাজের
সীমিত জমি, কম সম্পদ ও অনিয়মিত আয়ের কারণে এসব পরিবারের সঞ্চয় ও অতিরিক্ত মূলধন কম। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হলে বা বাজারে ফসলের দাম কমে গেলে তাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
উৎপাদন ও জীবিকা ঝুঁকিতে
জরুরি কৃষি সহায়তা প্রয়োজন— এমন পরিবারের ১৬ শতাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েছে। আগের জরিপে এ হার ছিল ১০ শতাংশ। এ ছাড়া ৬৫ শতাংশ কৃষিনির্ভর পরিবার কোনো না কোনো সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে। খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ৬৭ শতাংশ পরিবার বাকিতে খাদ্য কিনেছে এবং ৬৬ শতাংশ ব্যয় কমিয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার বীজ, সার, পশুখাদ্যসহ কৃষি উপকরণে ব্যয় কমিয়েছে। এতে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদন ও আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ শতাংশ কৃষিনির্ভর পরিবার মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবার জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সংকটকালীন বা জরুরি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
ফসল উৎপাদন ও বিক্রিতে সমস্যা
ফসল উৎপাদনকারী পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক উৎপাদন-সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলেছে। এর মধ্যে রয়েছে জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকা, ফসলের রোগ, সার পাওয়ার অসুবিধা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট। আগের জরিপের তুলনায় ফসলের রোগের কথা বলা পরিবার বেড়েছে ৩০ শতাংশ। একইভাবে সার পাওয়ার সমস্যার কথা বলা পরিবার বেড়েছে ১৭ শতাংশ। ফসল বিক্রির ক্ষেত্রেও কৃষকরা সমস্যায় পড়েছেন। আগের জরিপে ১০০ কৃষি পরিবারের মধ্যে ৯টি ফসল বিক্রিতে সমস্যার কথা জানিয়েছিল। এবার
দরকার কৃষি উপকরণ ও নগদ সহায়তা
পরিবারগুলোর ৭২ শতাংশ ফসলের উপকরণ চেয়েছে। ৫৭ শতাংশ নগদ সহায়তা, ৫১ শতাংশ গবাদি পশুর খাদ্য এবং ৩৩ শতাংশ পশু চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনের কথা বলেছে। এ ছাড়া ২৬ শতাংশ পরিবার ফসল উৎপাদন ও সংরক্ষণে অবকাঠামো সহায়তা এবং ১৮ শতাংশ খাদ্য সহায়তা চেয়েছে।
এফএও বলছে, কৃষকদের সহায়তায় শুধু কৃষি উপকরণ দিলেই হবে না, আমন মৌসুম সামনে রেখে সময়মতো নগদ অর্থ, পশুখাদ্য, পশু চিকিৎসা এবং পানি ব্যবস্থাপনার সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।
এফএওর পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আগামীর সময়কে বললেন, হাওরাঞ্চল ও চট্টগ্রামে বন্যায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আগামী বছর থেকে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের নতুন জাতের ব্রি ধান-১১৮ দেওয়া হবে। এই জাতের ধান চলতি মৌসুমের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে রোপণ করা যায়। ফলে বন্যার পানি আসার আগেই কৃষকরা ঘরে ফসল তুলতে পারবেন।
কৃষিমন্ত্রী বললেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সরকারের বেশ কয়েকটি নগদ সহায়তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের জন্য এরই মধ্যে সহায়তার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাদের সার ও বীজ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদেরও সহায়তা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে এ কাজে এফএওর সহযোগিতা নেওয়া হবে।
কৃষকদের বড় সমস্যা জমির মালিকানা না থাকা
লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেছেন, বাংলাদেশে কৃষকদের একটি বড় অংশ এখন যে জমিতে চাষ করেন, তার মালিক তারা নন। আগাম টাকা দিয়ে অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে তাদের কৃষিকাজ করতে হয়। কৃষকদের এই সমস্যার সমাধানে তেভাগা ব্যবস্থা চালুর বিকল্প নেই।
তার মতে, ‘এককালীন নগদ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নানা সমস্যা। প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে এ সহায়তা পৌঁছানো কঠিন। অনেক সময় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঠিক করেন, কারা সহায়তা পাবেন আর কারা পাবেন না। তেভাগা ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য অংশ পাবেন এবং তাদের আয় ও জীবিকা কিছুটা সুরক্ষিত হবে।’



