সম্পাদকীয়
অন্নাভাবে অন্নদাতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সিংহভাগ মানুষের খাদ্যের জোগান দেন যে কৃষক, সেই কৃষকের ঘরেই আজ খাদ্যের অভাব। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের ৬৭ শতাংশ কৃষি পরিবার বর্তমানে বেঁচে থাকার তাগিদে বাকিতে খাদ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এই তথ্য গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। যে কৃষি খাতকে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়, সেই খাতের কারিগরদের এহেন দুর্দশা আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির দাবিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গতকাল আগামীর সময় পত্রিকায় একটি জরিপের প্রতিবেদনের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছর ২০ এপ্রিল থেকে ২৭ মে পর্যন্ত জরিপটি পরিচালিত হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) জরুরি পরিস্থিতিতে কৃষি সহায়তা পর্যবেক্ষণবিষয়ক ওই প্রতিবেদনে ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের আয়, উৎপাদন, ফসল বিক্রি, খাদ্যাভ্যাস, কৃষিকাজ-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, এ মুহূর্তে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবারের জন্য কৃষি সহায়তা জরুরি।
সাম্প্রতিককালে গ্রামীণ পর্যায়ে মানুষের প্রকৃত আয় লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে। অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং কৃষি উপকরণের আকাশচুম্বী দাম এর অন্যতম কারণ। সার, বীজ, কীটনাশক এবং সেচের খরচ যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে ফসল তোলার পর ঋণ শোধ করতেই কৃষকের পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। বছরের বাকি দিনগুলোতে পরিবারের খাবারের জোগান দিতে তাদের আবার নতুন করে ধারদেনা বা বাকির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই দুষ্টচক্র দেশের কৃষকসমাজকে ক্রমান্বয়ে এক দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাকিতে খাদ্য কেনার প্রভাব বহুমুখী। এর ফলে কৃষি পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে শুধু পেট ভরানোর মতো সস্তা খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে গ্রামীণ শিশু ও নারীদের পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদে যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, স্থানীয় মুদি দোকানদার বা মহাজনদের ওপরও বকেয়া টাকার চাপ বাড়ছে, যা গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসার চাকা স্থবির করে দিচ্ছে।
ক্ষুদ্র কৃষকদের বিপদটা বেশি। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বলছে, বর্ষা মৌসুম তীব্র হওয়া, আয় কমে যাওয়া, খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং কৃষি উপকরণ সংকটে ক্ষুদ্র কৃষকদের পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এমনিতেই সীমিত জমি, কম সম্পদ ও অনিয়মিত আয়ের কারণে এসব পরিবারের সঞ্চয় ও অতিরিক্ত মূলধন কম। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হলে বা বাজারে ফসলের দাম কমে গেলে তাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, কৃষক পরিবারগুলোকে অবিলম্বে নগদ সহায়তা দিতে হবে। গ্রামীণ বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে টিসিবির মতো খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির ওএমএস কার্যক্রম প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা যাতে সরাসরি বাজারে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারেন, সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি। এ ছাড়া প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং সার-ডিজেলে সরাসরি নগদ ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। কৃষকদের সহায়তায় শুধু কৃষি উপকরণ দিলেই হবে না; আমন মৌসুম সামনে রেখে সময়মতো নগদ অর্থ, পশুখাদ্য, পশু চিকিৎসা এবং পানি ব্যবস্থাপনার সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্যের জোগানদাতা নিজেই যখন ক্ষুধার্ত থাকে, তখন সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আগেই সরকারকে অতিদ্রুত এই খাদ্য সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।







