পাহারা দিয়ে পাহাড় রক্ষা করা যাবে না

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় স্রেফ কোনো ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়; এটি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য প্রাণপ্রবাহ। এই অঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার, জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার, জলবায়ু সহনশীলতার অকৃত্রিম প্রাকৃতিক ঢাল এবং বহু মানুষের জীবিকার মূল ভিত্তি। অথচ কয়েক দশক ধরে আমরা পাহাড়কে প্রকৃতির উপহার হিসেবে নয়, বরং শুধু সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে চলেছি। এর অবশ্যম্ভাবী ফল আজ আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান— নির্বিচারে বন উজাড়, পাহাড়ের মাটি ক্ষয়, ঝিরি-ছড়ার প্রাকৃতিক প্রবাহের অবক্ষয়, আকস্মিক ভূমিধস এবং জীববৈচিত্র্যের দ্রুত ও বিপজ্জনক হ্রাস।
এই লেখার উদ্দেশ্য শুধু কোনো সংকটের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং একটি দূরদর্শী সমাধানভিত্তিক রূপরেখা উপস্থাপন করা। আমাদের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের মূল দর্শন এখন পুরোপুরি বদলে ফেলতে হবে। ‘এক্সট্রাকশন’ বা নিছক শোষণমূলক আহরণ থেকে আমাদের সরে এসে স্থান দিতে হবে ‘রিজেনারেশন’ বা প্রকৃতির পুনরুজ্জীবনের দর্শনে।
পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান সময়ের অন্যতম গভীর সংকট হলো এর সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ভূমি ব্যবস্থাপনা। কাসাভা, কচু, আদা, হলুদ ও আনারসের মতো লাভজনক মৌসুমি ফসলের আবাদ করতে গিয়ে পাহাড়ের আদি ও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক আচ্ছাদন সম্পূর্ণ ধ্বংস বা পরিষ্কার করে ফেলা হচ্ছে। পাহাড়ি ঢালে এ ধরনের অপরিকল্পিত চাষাবাদ দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক মারাত্মক ব্যয়বহুল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফসলের চাষ শুরু করার আগে পাহাড়ের গায়ের প্রাকৃতিক গাছপালা ও ঘাস পরিষ্কার করে মাটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হয়। ফলে বর্ষার তীব্র বৃষ্টির পানির সঙ্গে পাহাড়ের উর্বর টপসয়েল বা উপরিভাগের মাটি ধুয়ে সরাসরি নিচের ঝিরি, ছড়া ও নদীতে গিয়ে জমা হয়। এতে মাটির নিজস্ব উর্বরতা দ্রুত কমে যায়, নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্য নষ্ট হয়, জলজ প্রাণীর আবাস ধ্বংস হয় এবং বর্ষায় ভূমিধসের ঝুঁকি বহু গুণ বৃদ্ধি পায়।
এই কঠোর বাস্তবতা সামনে রেখেই পাহাড়ের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিশেষ কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। পাহাড়ের কৃষিনীতি শুধু কত টন ফসল উৎপাদিত হলো, সেই প্রচলিত হিসাবে আটকে রাখা যাবে না। এর সঙ্গে নতুন মানদণ্ড যুক্ত করতে হবে— কতটুকু মাটি সুরক্ষিত থাকল, কতটি প্রাকৃতিক পানির উৎস সচল থাকল, কী পরিমাণ গাছের আচ্ছাদন বজায় রাখা সম্ভব হলো, কৃষকের আয় কতটা দীর্ঘস্থায়ী হলো এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের কতটা সুরক্ষা নিশ্চিত হলো।
এই লক্ষ্য অর্জনে আমি তিন স্তরভিত্তিক পাহাড়ি অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রস্তাব করছি। প্রথম স্তরটি হবে পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়া। এখানে শুধু প্রাকৃতিক বন, স্থানীয় দেশীয় বৃক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠভিত্তিক বনায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ অঞ্চল হবে ভবিষ্যতের পানি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং কার্বন অর্থনীতির মূল ভিত্তি। দ্বিতীয় স্তরটি হলো মধ্য ঢাল। এখানে আম, কাঁঠাল, লিচু, মাল্টা, লেবু ও অন্যান্য বহুবর্ষজীবী মিশ্র ফলভিত্তিক কৃষি গড়ে তোলা যেতে পারে। তৃতীয় স্তরটি নিচের ঢাল ও উপত্যকা। এখানে কলা, বাঁশ ও মাটিকে সর্বদা আচ্ছাদিত রাখে— এমন টেকসই কৃষি ব্যবস্থা উৎসাহিত করা যেতে পারে।
বন, পানি, কার্বন, জীববৈচিত্র্য— আমাদের জাতীয় কাঠামোর সবকিছুর কেন্দ্রে মানুষকে রাখতে হবে। স্থানীয় মানুষ যদি এর দ্বারা আর্থিকভাবে লাভবান না হয়, তবে পৃথিবীর কোনো সংরক্ষণ উদ্যোগই দীর্ঘ মেয়াদে সফল হতে পারে না
পাহাড় সংরক্ষণে আমরা নেপালের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। পাহাড়ি অঞ্চলে কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন বন ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে সফল ও আলোচিত উদাহরণ হলো নেপাল। সেখানে ২৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ফরেস্ট ইউজার গ্রুপ প্রায় ২৫ লাখ হেক্টর বন সফলভাবে ব্যবস্থাপনায় যুক্ত এবং এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ৩৫ লাখের বেশি পরিবার। নেপালের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি স্থানীয় মানুষের হাতে মালিকানা ও প্রকৃত অংশীদারত্ব তুলে দেওয়া। সেখানে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করে, বনজ সম্পদ আইনসম্মতভাবে ব্যবহার করে নিজেদের আয় নিশ্চিত করে এবং সেই আয়ের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় জনকল্যাণ ও উন্নয়নে ব্যয় করে। এর ফলে বন সংরক্ষণ স্থানীয় মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব ও স্বার্থের বিষয়ে পরিণত হয়।
শুধু নিছক আইন প্রয়োগ করে বা পাহারা বসিয়ে কখনো বন রক্ষা করা সম্ভব নয়। পাহাড়ের মানুষকে বাঁচাতে হলে তাদের হাতে বিকল্প আয়ের টেকসই পথ তুলে দিতে হবে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট গ্রিন জবস স্ট্র্যাটেজি বা সবুজ কর্মসংস্থান কৌশল গড়ে তোলা জরুরি। এর মধ্যে থাকতে পারে লাভজনক ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, পরিবেশবান্ধব বাঁশভিত্তিক কুটিরশিল্প, প্রকৃতিভিত্তিক ইকোট্যুরিজম, বনজ ও অ-বনজ পণ্যভিত্তিক উদ্যোগ, আধুনিক নার্সারি, পরিকল্পিত পুনর্বনায়ন কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক কার্বন অর্থনীতি। রাষ্ট্রের উচিত পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের বিশেষ প্রণোদনা চালু করা। করের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা পেলে বেসরকারি খাত পাহাড়ে সবুজ শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশে পাহাড় নিয়ে যেকোনো আলোচনা প্রায়ই ‘সংরক্ষণ বনাম উন্নয়ন’ নামক এক দীর্ঘ পুরনো বিতর্কে আটকে যায়। অথচ এ দুই বিপরীত ধারাকে একসঙ্গে সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া পুরোপুরি সম্ভব। যদি স্থানীয় ফল ও বাঁশ প্রক্রিয়াজাতকরণ, বনজ পণ্য, প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটন, কার্বন প্রকল্প এবং ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়, তবে এ অঞ্চলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এতে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ বন ধ্বংস করার পরিবর্তে বন সংরক্ষণ থেকেই তাদের জীবিকা ও আয় নিশ্চিত করতে পারবে।
বিশ্ব জুড়ে কার্বন বাজার এখন অত্যন্ত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বন সংরক্ষণ, বন পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব কার্বন সংরক্ষণকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা এখন আর কোনো অবাস্তব কল্পনা নয়। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রকৃতিভিত্তিক কার্বন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এর একটি মৌলিক ও অপরিহার্য শর্ত রয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এর সরাসরি উপকারভোগী হতে হবে। কার্বন অর্থনীতি যদি শুধু প্রকল্প পরিচালনাকারী বড় বড় প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে কখনোই টেকসই হবে না।
এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় বার্তা হলো কমিউনিটি। বন, পানি, কার্বন, জীববৈচিত্র্য— আমাদের জাতীয় কাঠামোর সবকিছুর কেন্দ্রে মানুষকে রাখতে হবে। কমিউনিটি বা স্থানীয় মানুষ যদি এর দ্বারা আর্থিকভাবে লাভবান না হয়, তবে পৃথিবীর কোনো সংরক্ষণ উদ্যোগই দীর্ঘ মেয়াদে সফল হতে পারে না। নেপাল, ভিয়েতনাম, কোস্টারিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য সফল রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা আমাদের একটাই মৌলিক শিক্ষা দেয়— মানুষকে উন্নয়নের অংশীদার করুন, মানুষই নিজ দায়িত্বে প্রকৃতিকে রক্ষা করবে।
পাহাড় পুনরুদ্ধার কোনো পাঁচ বছরের প্রকল্প নয়; এটি একটি পুরো প্রজন্মের ধারাবাহিক কাজ। এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথে ভুল হবে, নানামুখী সমালোচনা হবে, কিছু উদ্যোগ সাময়িকভাবে ব্যর্থও হতে পারে। কিন্তু শুধু সেই আশঙ্কায় কখনোই আমাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করা যাবে না। ধৈর্য ধরতে হবে, কমিউনিটিকে পাশে রাখতে হবে, প্রতিটি পদক্ষেপে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা— সমস্যার কান্নার চেয়ে সমাধানের বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। যদি আমরা সঠিক নীতি, সঠিক বিনিয়োগ এবং সঠিক অংশীদারত্বের টেকসই ভিত্তি স্থাপন করতে পারি, তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়কে বিশ্বমঞ্চে টেকসই পুনরুদ্ধারের এক উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক উদাহরণে পরিণত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের পাহাড়কে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক উপায় হলো মানুষকে বন থেকে বলপূর্বক দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং বন রক্ষা করেই মানুষের উন্নত আয় স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা। এখন সময় এসেছে একটি নতুন ঐতিহাসিক জাতীয় অঙ্গীকারের— পাহাড়কে শুধু সম্পদ আহরণের এলাকা হিসেবে নয়, বরং আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক মূলধন হিসেবে দেখার। এভাবেই রচিত হবে চট্টগ্রাম পাহাড়ের সোনালি ভবিষ্যৎ এবং এটাই হবে ২০৩৫ সালের প্রকৃত পুনরুদ্ধারের পথ।
লেখক: পরিবেশকর্মী, সংরক্ষণবিদ








