নিঃস্বার্থ ধাত্রীসেবায় খায়রুন নেছা

কেউ ডাকেন নানি, কেউ দাদি আবার কেউ ডাকেন চাচি। অন্তঃসত্ত্বাদের প্রসবব্যথা শুরু হলেই ডাক পড়ে খায়রুন নেছার। কখনো মধ্যরাত কখনো ভরদুপুরে। খবর পেলেই ছুটে যান প্রসূতির বাড়িতে। তার চেষ্টায় জন্ম নেয় ফুটফুটে নবজাতক। তার হাতের ছোঁয়ায় পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেছে প্রায় ৫০০ শিশু।
ধাত্রীর কাজ করে তিনি নেন না কোনো পারিশ্রমিক। খুশি হয়ে কেউ দেন একটি কাপড়, কেউ দেন মিষ্টি। আবার কেউ প্রসবের পর আর খোঁজই নেন না তার। কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে চার দশক ধরে এ কাজ করে যাচ্ছেন ৬৫ বছর বয়সী খায়রুন নেছা।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার হাতিন্দাহ ইউনিয়নের নতুনবস্তি গ্রামের খায়রুন নেছার বিয়ে হয় উপজেলার কলম গ্রামের জব্বার আলীর সঙ্গে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে কৃষিকাজ করেন। স্বামী জব্বার আলী মারা গেছেন।
প্রথমে গ্রামের এক ধাত্রীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। বর্তমানে নিজ গ্রাম ছাড়াও আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রামে সন্তান প্রসব করাতে যান খায়রুন নেছা।
নতুনবস্তি গ্রামের চাম্পা বেগম বললেন, ‘আমার প্রথম সন্তান খায়রুন চাচির মাধ্যমে প্রসব হয়। শুধু আমার নয়, এলাকার অনেকের সন্তান তার হাতে জন্ম নিয়েছে। প্রসবের জন্য ডাকলেই সংসারের কাজ ফেলে ছুটে যান তিনি।’
একই গ্রামের আসমা বেগম বললেন, ‘খায়রুন দাদির মাধ্যমে আমার প্রথম সন্তান প্রসব হয়। তিনি শুধু এলাকায় নয়, অনেক দূরেও যান সন্তান প্রসব করাতে।
‘শুধু সন্তান প্রসব নয়, এলাকার কেউ অসুস্থ হলে তাকে ডাকলেই তার সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে যান। হাসপাতালে ওই রোগীর সেবা শুশ্রূষা করেন। তিনি বেশ পরোপকারী। কারও বিপদ দেখলেই ছুটে যান,’ যোগ করেন আসমা।
সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজাহিদুল ইসলাম বললেন, ‘আমাদের সমাজের ধাত্রীরা নিঃস্বার্থভাবে অন্তঃসত্ত্বা মা-বোনদের প্রসব করিয়ে থাকেন। বিনিময়ে কোনো অর্থ নেন না। এটি একটি মহৎ কাজ। ধাত্রী মা-খালাদের মাধ্যমে তাদের এ কাজে আসা। তবে নবজাতক জন্মের আগে ও পরে কিছু চিকিৎসাসেবা থাকে, তা অনেক ধাত্রী জানেন না। সেজন্য ধাত্রীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।’ তিনি তথ্য দেন, ‘আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স রয়েছে। এখানেও স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে।’
খায়রুন নেছা বলছিলেন, ‘ভালো লাগা থেকেই এ কাজ শুরু করি। ৪০ বছর ধরে ধাত্রীর কাজ করছি, টাকার জন্য করিনি। অনেকে খুশি হয়ে টাকা দিতে চান, কিন্তু আমি নিই না। যত দিন বেঁচে থাকি, এ কাজ করে যাব।’







