পে স্কেল নিয়ে বেসরকারিরা শঙ্কায়

প্রতীকী ছবি
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেলের ঘোষণা আসতেই দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মুখে যখন হাসির ঝিলিক, ঠিক তখন অন্য এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কপালে চিন্তার ভাঁজ। দেশের শ্রমবাজারের সিংহভাগ জুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এই পে স্কেল পূর্বাভাস দিচ্ছে জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের। নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ে চলা এসব চাকরিজীবীর আশঙ্কা— সরকারি বেতন বাড়ার প্রভাবে বাজার থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া পর্যন্ত সব খরচ লাফিয়ে বাড়বে, অথচ তাদের আয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, পে স্কেলের প্রভাবে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়, যা চাহিদা বাড়িয়ে সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ‘মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি’ থেকে। নতুন পে স্কেলের ঘোষণা আসায় অসাধু ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা পে স্কেল কার্যকর হওয়ার আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম ও বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি এজন্য অতিরিক্ত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণ নিলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর তৈরি হতে পারে বাড়তি চাপ।
এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সীমিত আয়ের বেসরকারি কর্মীদের ওপর। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ বাড়লেও অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন বাড়ানোর কোনো নীতি নেই। এর ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে হয় এবং জমিয়ে রাখা সঞ্চয় ভাঙতে হয়। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান ও আয়ের অনিশ্চয়তা— দুইয়ের ব্যবধান এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, তাই বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, অতিরিক্ত কর আদায়ের পরিবর্তে যদি ব্যাংক ঋণ বা টাকা সৃষ্টির মাধ্যমে এই অর্থ জোগান দেওয়া হয়, তবে অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। বেতন বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে অর্থের সংস্থান, বাজারে পণ্যের সরবরাহ এবং মুদ্রা ও রাজস্বনীতির সঠিক সমন্বয়ের ওপর।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বললেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে এর অর্থায়ন এবং বাজারের সার্বিক মুদ্রাব্যবস্থাপনার ওপর। শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলে এবং তার বিপরীতে বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে তা অর্থনীতির ওপর উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। অর্থ জোগানের জন্য যদি অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বা টাকা ছাপানোর পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে মূল্যস্ফীতির পারদ আরও ওপরে উঠবে। এর সবচেয়ে বড় মাশুল গুনতে হবে নির্দিষ্ট আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবীদের, যাদের আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে কনজু্যমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলছিলেন, দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ায় এটি আগেই দরকার ছিল। তবে এর ফলে বেসরকারি খাত ও শিল্প শ্রমিকদের কাছ থেকে বেতন বাড়ানোর তীব্র চাপ তৈরি হবে, যা সামলানো উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি যোগ করেন, নীতিগতভাবে উৎপাদন বা পরিবহন খরচ না বাড়লেও ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে সব পণ্যের দাম ও বাসাভাড়া বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত দায় এসে পড়বে চরম চাপে থাকা বেসরকারি খাতের ওপর।







