এমপিওভুক্তদের জন্য লাগবে বাড়তি সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা

বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো দেশের ছয় লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকেও এই পে স্কেলের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষকরা বর্তমানে যে গ্রেডে আছেন, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সেই গ্রেডেই বর্ধিত মূল বেতন পাবেন। একই সঙ্গে মূল বেতনের সঙ্গে নির্ধারিত (১৫ শতাংশ) বাড়িভাড়াসহ সংশ্লিষ্ট ভাতাও বাড়বে। এ খাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা।
গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বেতন বৃদ্ধির বিস্তারিত তুলে ধরলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন কাঠামোর আওতায় থাকবেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কিছু বলেননি। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল মঙ্গলবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন পে স্কেলের সুবিধা পাবেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বাজেট শাখার দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় চার লাখ, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি চাকরি করছেন। নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীদের সর্বশেষ ডেটাবেজ ও বেতন-ভাতার হিসাব করা হচ্ছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের মতো সব ভাতা একসঙ্গে বা একই হারে এমপিওভুক্তদের ক্ষেত্রে কার্যকর আগে কখনো হয়নি, এবারও হবে না। কোন ভাতা কী হারে দেওয়া হবে, তা পৃথক সরকারি আদেশে নির্ধারণ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন আগামীর সময়কে বলেছেন, শিক্ষকদের কাজ হচ্ছে ক্লাসরুমে পড়ানো। তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দায়িত্ব সরকারের। সে কাজটি করা হচ্ছে। ক্যাবিনেটে শিক্ষকদের বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাদের চিন্তা করার কিছু নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেছেন, ‘এটি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা হতাশ হবেন না এতটুকু বলতে পারি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেলের সময়ও প্রথমে এমপিওভুক্তদের বিষয়ে স্পষ্টতা ছিল না। পরে বিশেষ পরিপত্রের মাধ্যমে তাদের সমন্বয় করা হয়েছিল। এবারও গেজেট প্রকাশের পর অর্থ বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করে আলাদা পরিপত্রের মাধ্যমে এই পে স্কেল সম্প্রসারণ করবে। ২০১৫ সালের আলাদা পরিপত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল পে স্কেলের মূল বেতনের সুবিধা পান। এরপর ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শিক্ষকরা ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন স্কেলের বর্ধিত মূল বেতন হাতে পান এবং পরে ২০১৭ সালে অন্যান্য ভাতা সমন্বয় করা হয়। এবারও একই প্রক্রিয়ায় কাজ করা হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আলাদা কোনো বেতন কাঠামো করা হবে না। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নির্ধারিত ২০টি গ্রেডের কাঠামোর সঙ্গেই এমপিওভুক্তদের বেতন সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী বর্তমানে যে গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সেই গ্রেডের সংশোধিত মূল বেতন পাবেন। এখন বেসরকারি শিক্ষকরা সর্বোচ্চ অর্নাস কলেজের অধ্যক্ষ (চতুর্থ গ্রেড) বেতন পান। সে হিসাব ধরেই প্রাক্কলন করা হয়েছে।
কাদের কতটা বাড়বে: এমপিওভুক্ত ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন নতুন কাঠামোয় সমন্বয় করায় সরকারের শিক্ষা খাতে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের বড় অংশই যাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন ও ভাতা সমন্বয়ে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া গ্রেড অনুযায়ী, ডিগ্রি কলেজের একজন অধ্যক্ষ, যিনি বর্তমানে চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার টাকা মূল বেতন পাচ্ছেন, নতুন বেতন কাঠামোতে তার মূল বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ টাকায়। একইভাবে ষষ্ঠ গ্রেডে থাকা সহকারী অধ্যাপকদের মূল বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৭১ হাজার টাকা হচ্ছে। কলেজ পর্যায়ের প্রভাষকদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নবম গ্রেডে কর্মরত একজন প্রভাষকের বর্তমান মূল বেতন ২২ হাজার থেকে ১৩০ শতাংশ বেড়ে নতুন পে স্কেলে অনুযায়ী পাবেন ৫০ হাজার ৬০০ টাকা।
মাধ্যমিক স্তরে সহকারী শিক্ষক বা বিএড ডিগ্রিধারী সহকারী শিক্ষকরা বর্তমানে দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা মূল বেতন পান। নতুন কাঠামোতে ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধিতে তা দাঁড়াবে ৩৮ হাজার ৭২০ টাকায়। অন্যদিকে বিএড সনদ ছাড়া ১১তম গ্রেডে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মূল বেতন বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বেড়ে হবে ৩০ হাজার ২৫০ টাকা। এ ছাড়া সর্বনিম্নের দিকে থাকা ২০তম গ্রেডের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী যেমন অফিস সহায়কের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ দেশের মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন থাকা ছয় লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এই পদভিত্তিক মূল বেতন বৃদ্ধির সরাসরি সুবিধা পাবেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেছেন, ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেলের গেজেট হওয়ার পর নতুন পরিপত্রের মাধ্যমে শিক্ষকদের অষ্টম পে স্কেলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। নবম পে স্কেলের গেজেট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বিষয়ে তথ্য-উপাত্তসহ প্রস্তুতি রয়েছে।
কেন আলাদা পরিপত্রে পে স্কেল: সরকারি কর্মচারীরা সরকারের রাজস্ব খাত থেকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৩-এর অধীনে পরিচালিত হন। এজন্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও জাতীয় পে স্কেলের গেজেট জারির মাধ্যমে তাদের বেতন সরাসরি কার্যকর হয়। অন্যদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পরিচালিত হন ‘জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা’র অধীনে। প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোর এই ভিন্নতার কারণে একই গেজেটে তাদের (শিক্ষক) অন্তর্ভুক্ত না করে পৃথক পরিপত্র জারি করে বেতন-ভাতা সমন্বয় করা হয় বলে এমনটি জানালেন কর্মকর্তারা।
আরেকটি দিক হলো— এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং সরকারি অনুদান বা এমপিও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাদের নিয়োগ হয় বেসরকারি ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে এবং স্কুল ও কলেজ, মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা দ্বারা তারা নিয়ন্ত্রিত হন। শিক্ষক-কর্মচারী মূল বেতনের শতভাগ অংশ পান। কিন্তু বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা সরকারিদের মতো পান না। এর মধ্যে গত বছর এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বাড়িভাড়া মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এক হাজার টাকা করে বাড়িভাড়া পেয়ে আসছিলেন।
শিক্ষক নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বেতন-ভাতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে। জাতীয় পে স্কেলের সঙ্গে এমপিওভুক্তদের বেতন সমন্বয় করা হলেও ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এখনো পার্থক্য রয়েছে। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।







