স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষার নামে হয়রানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আধুনিক সমাজে কর ফাঁকি রোধ এবং আয়কর আইন ও বিধির প্রতিপালন নিশ্চিত করার জন্য ‘অডিট’ বা নিরীক্ষা একটি অত্যাবশ্যক পদ্ধতি। তবে আয়কর রিটার্নের নমুনা নির্বাচনে দৈবচয়ন পদ্ধতি (র্যানডম সিলেকশন) প্রয়োগের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে তা কখনোই ন্যায়সংগত হয় না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়।
আমরা জানি, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তো সর্বনিম্নের পাশাপাশি ক্রমে নিম্নগামী। তাই দেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত কর রাজস্ব প্রশাসনের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া, বিশেষ করে কর সংগ্রহের জন্য যেসব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, তা পর্যালোচনা করা। এনবিআর কর্তৃক সম্প্রতি আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষায় অনুসৃত পক্ষপাতমূলক নমুনায়ন পদ্ধতি এ ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রের অডিটিং প্র্যাকটিসেস বোর্ড (এপিবি) অডিট বা নিরীক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছে— আর্থিক বিবরণীর অডিট হলো এমন একটি অনুশীলন, যার মূল লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সময় শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত বিবরণীটি সার্বিক আয়-ব্যয় এবং লাভ-লোকসানের একটি সঠিক ও ন্যায্য চিত্র তুলে ধরেছে কি না, তা যাচাই করা।
বাংলাদেশে পূর্ববর্তী ‘আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪’ বাতিল করে জাতীয় সংসদ ২০২৩ সালের জুন মাসে নতুন ‘আয়কর আইন, ২০২৩’ পাস করে। এ আইনের ১৮০ ধারা অনুযায়ী স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে দাখিলকৃত রিটার্ন অডিট করা এবং ১৮২ ধারা অনুযায়ী অডিট পরিচালনা ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫ সালে ‘আয়কর রিটার্ন অডিট নির্দেশিকা, ২০২৫’ প্রণয়ন করে। এ নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য ছিল কর ফাঁকি ও কর পরিহারের প্রবণতা রোধ করা, সুস্থ কর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো, কর ফাঁকির ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা এবং আয়কর কর্মকর্তারা যাতে আইন মেনে চলেন, তা নিশ্চিত করা।
যেসব করদাতার রিটার্ন অতীতে ‘কখনোই’ অডিটের আওতায় আসেনি, তাদের মধ্য থেকেই মোট বাছাইকৃত রিটার্নের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নির্বাচন করতে হবে। শর্তটি সরাসরি ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতার নীতির চরম লঙ্ঘন
তবে নির্দেশিকার ৩ ও ৪ নম্বর অংশ গভীরভাবে পরীক্ষা করলে কিছু অসংগতি ও গুরুতর ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্দেশিকার অনুচ্ছেদ ৩(ক) অনুযায়ী, ১৮০ ধারায় প্রাপ্ত রিটার্নগুলোর মধ্য থেকে এনবিআর নির্ধারিত পদ্ধতিতে অডিটের জন্য বাছাই করবে। অনুচ্ছেদ ৩(খ)-এ বলা হয়, শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষায় এনবিআর একটি ঝুঁকিভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারেবল পদ্ধতির মাধ্যমে অডিটের জন্য রিটার্ন নির্বাচন করবে।
কিন্তু এই সুন্দর নীতির ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় অনুচ্ছেদ ৪(ঠ)-এ। সেখানে নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেসব করদাতার রিটার্ন অতীতে ‘কখনোই’ অডিটের আওতায় আসেনি, তাদের মধ্য থেকেই মোট বাছাইকৃত রিটার্নের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নির্বাচন করতে হবে। এই শর্তটি সরাসরি ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতার নীতির চরম লঙ্ঘন। কারণ, এর ফলে অডিটের নমুনা বাছাই আর দৈবচয়নভিত্তিক থাকে না; বরং তা পক্ষপাতমূলক হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যানের ভাষায় ‘দৈবচয়নভিত্তিক নমুনায়ন’ (Random Sampling) হলো এমন এক পদ্ধতি, যেখানে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিটি সদস্যের নির্বাচিত হওয়ার সমান সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ‘পক্ষপাতমূলক নমুনায়ন’ (Biased Sampling)-এ নির্দিষ্ট কিছু সদস্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বা বাদ দেওয়া হয়। ফলে সেই নমুনা আর পুরো জনগোষ্ঠীর নিরপেক্ষ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। যখনই মোট অডিটের এক-তৃতীয়াংশ বাধ্যতামূলকভাবে ‘পূর্বে অনিরীক্ষিত’ করদাতাদের দিয়ে পূরণ করার নিয়ম করা হয়, তখন পুরো প্রক্রিয়াটি দৈবচয়ন না হয়ে উক্ত শ্রেণির প্রতি চরম পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে। তা ছাড়া ৪ নম্বর অংশের নিয়মগুলো যে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়— এই মৌলিক শর্তটিও এখানে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এখানে সরাসরি নীতি ও ন্যায্যতার প্রশ্নও চলে আসে। সহজ কথায়, অতীতে যে করদাতাদের কখনো অডিটে ডাকা হয়নি, এর কারণ নিশ্চয়ই এটাই ছিল যে তাদের জমা দেওয়া কাগজপত্রে কোনো সন্দেহজনক বা অপরাধমূলক উপাদান ছিল না। ফলে আজ এসে তাদের জোর করে অডিটের মুখোমুখি দাঁড় করানোটা অনেকটা সততার সঙ্গেই রিটার্ন দাখিল করে আসার অপরাধে শাস্তি দেওয়ার শামিল। মাঠে কোনো ফাউল না করা সত্ত্বেও একজন সুশৃঙ্খল ফুটবল খেলোয়াড়কে অযথা হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর সঙ্গে বিষয়টির সরাসরি তুলনা করা চলে।
অন্যায্য এই পক্ষপাতমূলক নমুনায়ন সাধারণ ও নিরীহ করদাতাদের জীবনে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলছে, এবার তা খতিয়ে দেখা যাক—
আসল অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া: এক-তৃতীয়াংশ নমুনা বাধ্যতামূলকভাবে অতীতে অডিট না হওয়া করদাতাদের থেকে পূরণ করায় প্রকৃত সন্দেহজনক বা ঝুঁকিপূর্ণ করদাতারা অডিটের আওতা থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। এতে এনবিআর একদিকে যেমন মোটা অঙ্কের বাড়তি কর আহরণের বড় সুযোগ হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থানও মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
নিরীহ সিনিয়র সিটিজেনদের হয়রানি: এ অদ্ভুত নিয়ম অনেক নিরীহ ও নির্দোষ করদাতার জীবনে ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ হিসেবে এসেছে। বিশেষ করে ষাট বা সত্তরোর্ধ্ব বয়সের অনেক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি জীবনে কখনো অডিটের জটিল ঝামেলায় পড়েননি। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে, প্রান্তিক দূরবর্তী গাঁয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক কিংবা প্রবীণ সরকারি পেনশনভোগীরাও এনবিআরের এ নির্দয় পরিসংখ্যানিক খেলার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগা প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অডিটের নোটিস চরম ভয়াবহ ও মানসিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, এনবিআর ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রথম দফায় অডিটের জন্য ১৫ হাজার ৪৯৪টি রিটার্ন এবং পরে ২০২৩-২৪ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন থেকে আরও ৭২ হাজার ৩৪১টি রিটার্ন নির্বাচন করে। প্রতিটি কর সার্কেলকে সর্বনিম্ন ২০টি এবং সর্বোচ্চ ২০০টি পর্যন্ত রিটার্ন বাছাই করতে বাধ্য করা হয়েছে। উদ্যোগটি মূলত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম শুরু হয়েছিল এবং পরে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারও সেই একই ভুল নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে।
তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতো একজন সুখ্যাত ও অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কীভাবে এমন ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশিকা অনুমোদিত ও কার্যকর হলো! বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও প্রবীণ ব্যবসায়ী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। হিসাববিদ্যায় তার প্রগাঢ় জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশবাসী আশা করে, তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক নির্দেশনা প্রদান করবেন এবং কর রাজস্ব প্রশাসনে প্রকৃত ন্যায্যতা, স্বয়ংক্রিয় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনবেন।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও ‘বাংলাদেশ কোয়ার্টারলি’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক







