১০৩৯৪ কোটি টাকার মূলধন উধাও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের শেয়ারবাজারে সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাস ছিল বিনিয়োগকারীদের জন্য হতাশা ও আতঙ্কের মাস। এ মাসে বাজারের প্রধান মূল্যসূচক কমেছে প্রায় ৩০০ পয়েন্ট। এর পাশাপাশি বাজার মূলধন থেকে উধাও হয়ে গেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার বেশি। দরপতনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেয়ার কেনাবেচা বা লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বাজারে তারল্য ও আস্থার সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন মার্জিন ঋণ নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাজারে হস্তক্ষেপে অনীহা, ডিএসইর তাৎক্ষণিক ব্রোকারেজ হাউজ ইনস্পেকশন এবং আতঙ্কিত শেয়ার বিক্রির প্রবণতা আগস্টের পতনকে তীব্র করেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারের পরিস্থিতিকে করেছে আরও নাজুক।
আগস্টের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সব সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার ১৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। মাসের শেষ কার্যদিবস ৩১ আগস্ট লেনদেন শেষে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
বাজার মূলধনের এ পতন সরাসরি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর বাজারমূল্যে আঘাত করেছে। আগস্ট জুড়ে শেয়ারদর কমে সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ারের বাজারমূল্য কমেছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
আগস্টের শুরুতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্ট। ৩১ আগস্ট লেনদেন শেষে তা নেমে আসে ৫ হাজার ৫৯৮ পয়েন্টে। এক মাসে সূচক কমেছে ২৯৮ পয়েন্ট, যা প্রায় ৫ শতাংশ পতনের সমান।
সূচক ও বাজার মূলধনের পতনের চেয়েও বাজারের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে লেনদেনের ভয়াবহ সংকোচন। আগস্টের শুরুতে ডিএসইতে লেনদেন ছিল ১ হাজার ৪৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। মাসের শেষ তা নেমে আসে মাত্র ৪৭৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে লেনদেন কমেছে ৫৬৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৪ শতাংশ।
দরপতনের সময় লেনদেন স্বাভাবিক থাকলে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি থাকে এবং কম দামে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দরপতনের সঙ্গে লেনদেনও যদি দ্রুত কমে যায়, তাহলে সেটি বাজারে ক্রেতার সংকট, তারল্য সংকট ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থার বড় সংকেত। আগস্টের বাজারে ঠিক সেটিই দেখা গেছে।
এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বলেছেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বিএসইসি ও ডিএসই নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে কোনো ব্রোকারেজ হাউজ থেকে যেন আরেকটি ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ না হয়, তাই কিছু ব্রোকারেজ হাউজে আকস্মিক পরিদর্শন করা হচ্ছে। এটিকে অনেকে ভুল বুঝে আতঙ্কিত হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও শেয়ারবাজারের জন্য সহায়ক ছিল না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
এসব কারণে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির মুনাফায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএসইর এই পরিচালক। ফলে কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় ও লভ্যাংশ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেয়ারের দরে।
এক মাসে বাজার মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি কমার পাশাপাশি লেনদেন ৫৪ শতাংশ কমে যাওয়া বাজারের দুর্বলতার গভীরতাই প্রকাশ করছে। শুধু সূচক বাড়িয়ে এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহ এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, তারল্য বাড়ানো এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মৌলভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ ছাড়া বাজারের এ মন্দা কাটানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







