খেলাপিরা হবেন আরও বড় খেলাপি
- হাজার কোটির ঋণখেলাপিদের বিশেষ ছাড়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যত বড় খেলাপি তত বড় ছাড়। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বারবার ব্যাংক থেকে ঋণ নেন প্রভাবশালীরা। সামান্য টাকা পরিশোধেই হয়ে যান খেলাপিমুক্ত। আবার আগের চেয়ে বেশি ঋণ নেন। ফের খেলাপির তালিকায় নাম লেখান। হয়ে যান বড় খেলাপি। এমন অব্যবস্থাপনায় লাগামহীন হয়ে পড়েছে ঋণ আদায়। নানা পদক্ষেপের পরও আসছে না কোনো কার্যকর ফল।
এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের কিস্তি পরিশোধে যে ছাড় দিয়েছে, তাতে তলানিতে নামবে ঋণ আদায়— এমনটি মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং নীতি-বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ বড় হলে বড় ছাড় পাওয়া যায়— এ ধারণা থেকে অনেক ভালো গ্রাহক এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা পেতে স্বেচ্ছায় বড় খেলাপি হতে চাইবেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শুধু বর্তমান সরকারই নয়, অন্তর্বর্তী ও আওয়ামী লীগ সরকারও একইভাবে খেলাপিদের সুবিধা দিতে অন্তত অর্ধশত সার্কুলার ও বিশেষ আদেশ দিয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, খেলাপি কমাতে নামমাত্র ১ কিংবা ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধে পুনঃতফসিলের সুযোগ। এতে ঋণ নিয়মিত হচ্ছে; কিন্তু আদায় বাড়ছে না। সবশেষে ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ। অথচ গত মার্চ পর্যন্ত ঘোষিত খেলাপি ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। বাকি প্রায় সোয়া ৬ লাখ কোটি টাকার ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের অজুহাতে খেলাপির খাতার বাইরে রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ঋণ পুনঃতফসিলে এককালীন পরিশোধ ছিল ১০-১৫ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, বাংলাদেশে বড় ঋণ আদায় হচ্ছে না— এটা একটা সংস্কৃতির মতো রূপ ধারণ করেছে। কারণ ঋণ আদায় হচ্ছে না তা নিয়ে যা হচ্ছে, তা বাস্তব ব্যাংকিং না। আর ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপিদের ছাড় দিলে তারা নতুন ঋণ পাবেন। খেলাপি কমবে। কিন্তু আদায় তো তেমন হবে না। এভাবে বড় খেলাপিরা ছাড় পেলে আদায় তলানিতে নেমে যাবে। এরকম যত সুবিধা দেওয়া হোক না কেন, ভালো কাজ করে না। সুফল মেলে না। এতে ভালো ঋণগ্রহীতারা ইচ্ছা করে বড় খেলাপি হয়ে যাবেন। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা মেনে তারা খেলাপি হবেন না। আদায়ও হবে না। এমন উৎসাহ ব্যাপকভাবে ছড়ালে খেলাপি কোথায় গিয়ে ঠেকবে? এর জন্য দায়ী কে, কেন, কার স্বার্থে— তা বুঝে নিতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন আগামীর সময়কে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নীতিটির উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত সমস্যায় পড়া; কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানকে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান ও উৎপাদন রক্ষা করা। তবে এর সুফল নির্ভর করবে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাছাই ও তদারকির মানের ওপর। সুবিধাটি নির্বিচারে দেওয়া হলে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহক যদি দেখেন যে, বড় ঋণগ্রহীতারা সামান্য ডাউন পেমেন্ট (এককালীন পরিশোধ) দিয়ে দীর্ঘ সময়, গ্রেস পিরিয়ড এবং নতুন অর্থায়নের সুযোগ পাচ্ছেন, তাহলে ব্যাংক খাতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে। এতে ধারণা তৈরি হবে যে, ঋণের আকার যত বড়, বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। একে অর্থনীতিতে ‘নৈতিক ঝুঁকি’ বলা হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. ফাহমিদা বললেন, বড় খেলাপিদের নতুন অর্থায়ন দেওয়া হলে সীমিত ব্যাংকসম্পদ আবারও তাদের কাছেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে ভালো গ্রাহক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই নতুন ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে না দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ, ব্যবসা সচল হওয়ার সম্ভাবনা, ঋণের ব্যবহার ও মালিকদের নিজস্ব আর্থিক অংশগ্রহণ যাচাই করতে হবে। প্রতিটি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রকাশ, স্বাধীন অডিট এবং কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুবিধা বাতিলের বিধান থাকাও জরুরি। তাহলেই এ নীতি খেলাপি ঋণ আড়াল করার পরিবর্তে আদায় ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।
২০২৫ সালের ৭ মে, ব্যবসায়ীদের আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর লক্ষ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ নীতি-সহায়তার নীতিমালা ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা নেওয়া ঋণ হিসাবগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব ঋণ ‘এক্সিট অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে জেনারেল প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে বলা হয়। পুরো অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান ঋণসীমার বাইরে নতুন কোনো ঋণ পাবে না— এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ১ হাজার কোটি টাকার খেলাপিদের ছাড় আগের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকারের ভাষ্য, ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে সোচ্চার। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে ও চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সুযোগ দিয়েছে। এটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এখন গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়ছে। তবে এ সুযোগ গণহারে না দিয়ে যেসব ব্যবসায়ী পরীক্ষিত ও ভালো এবং পরিস্থিতির কারণে খেলাপি হয়েছেন, শুধু তাদের এ সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তাহলে সবার কাছে একটা ভালো বার্তা যাবে। তা না হলে নতুন খেলাপির সুযোগ নিতে ভালো গ্রাহক ঋণের কিস্তি বন্ধ করে দেবেন। তখন কী হবে, তা ভাবা উচিত নীতিনির্ধারকদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। গত ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আগামীর সময়কে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রে সাময়িক সময়ের জন্য নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ঋণগ্রহীতা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সুদব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমেছে। আবার জ্বালানির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। এসব বিবেচনায় ব্যবসা চালাতে যাদের বেশি ঋণ দরকার, তাদের জন্য সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের ছাড় উসকে দেবে, তা আমলে নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন করে ইচ্ছা করে কেউ খেলাপি হলে তাকে তো সুদ দিতে হবে। সেই হিসাব করে ইচ্ছা করে খেলাপির ঘটনা ঘটবে না— এমনটি মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র।
গত ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান খেলাপি ঋণ নিয়ে এক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। ওই সভায় খেলাপি ঋণের সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে অনাদায়ী ঋণ ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আর পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ৪ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। আদালতে আটকা প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।







