১৫০০ কোটি টাকার ধাক্কায় পেছাল এক গ্রেড এক পেনশন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘এক পদ এক পেনশন’ বা ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালু করা যাচ্ছে না এখনই। চাকরিজীবীদের ডেটাবেজের ঘাটতি এবং দেড় হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বোঝার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে পদ্ধতিটির বাস্তবায়ন। অবশ্য অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর এনেছে নিট পেনশনের সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ঘোষণা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানালেন, নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর করা হয়েছে সদ্য ঘোষিত নবম পে স্কেলে।
সামরিক ও বেসামরিকের ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তা ছাড়া ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া বেসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্যও নেই। েয কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে পদ্ধতিটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিট পেনশন বৃদ্ধি বাস্তবায়নে বছর অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ৫ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। বিপরীতে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি বাস্তবায়নে দরকার হবে দেড় হাজার কোটি টাকা।
সূত্র আরও জানায়, এ মুহূর্তে সরকার অর্থ সংকটে আছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। যে কারণে বাড়তি আরও দেড় হাজার কোটি টাকার চাপ নেওয়া হয়নি।
অর্থ সংকট ছাড়াও সরকারের ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস++) ২০১৯ সালের আগে অবসরে যাওয়া প্রায় ৭ লাখ কর্মচারীর কোনো গ্রেডভিত্তিক তথ্য সংরক্ষিত নেই। ২০১৯ সাল থেকে পেনশনভোগীদের ইএফটি ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করা হয়। শুরু থেকেই ইএফটি ডেটাবেজে পেনশনভোগীর গ্রেডভিত্তিক তথ্য এন্ট্রির ফিল্ড সন্নিবেশ করা হয়। তবে ডেটাবেজে এই ফিল্ডটি ঐচ্ছিক রাখা হয়। বাস্তবতার নিরিখে এটি করা হয়েছিল। কারণ অধিকাংশ বয়স্ক পেনশনভোগী সঠিকভাবে এ তথ্য দিতে পারেন না। বর্তমানে ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার। এ ছাড়া পারিবারিক পেনশনভোগীরা এ-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য দিতে পারেন না। পারিবারিক পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। এসব বিবেচনায় ডেটাবেজে গ্রেডভিত্তিক তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সন্নিবেশ করা হয়নি। ফলে তথ্যের প্রাপ্য ও সঠিকতা বিবেচনায় এই ফিল্ডটি অপশনাল করা হয়। ফলে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার পেনশনভোগীর ডেটাবেজে গ্রেডসংক্রান্ত তথ্য নেই। ২০১৯ সালের আগে যেসব পেনশনভোগী অবসরে গেছেন, তাদের গ্রেডসংক্রান্ত তথ্যও কোনো ডেটাবেজে নেই। এই সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। চেষ্টা করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব পেনশনভোগীর এ তথ্য আপডেট করা সম্ভব নয়।
অবশিষ্ট ২ লাখ ৫০ পেনশনভোগী যারা ২০১৯ সালের পরে পেনশনে গেছেন, তাদের তথ্য ‘এমপ্লয়ি ফিক্সেশন ডেটাবেজ’ থেকে পাওয়া সম্ভব। তবে কিছু ক্ষেত্রে এ তথ্য গ্রহণের আগে ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, এই বিবেচনায় তথ্য সংগ্রহ ও আপডেট সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার পেনশনারের গ্রেডসংক্রান্ত ডেটাবেজ খালি থাকায় ম্যানুয়ালি ৯ লাখ ৫০ হাজার কর্মচারীর তথ্য সংগ্রহ করা প্রাতিষ্ঠানিক বিলুপ্তির কারণে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই জটিলতায় ‘এক পদ এক পেনশন’ আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এসব দিক বিবেচনায় ২০৩০ সালে এ পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে নতুন পে স্কেলে স্বল্প আয়ের অবসরভোগীদের নিট পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি (ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা) এবং সমর্পণের হার ১:২৯৫ পর্যন্ত উন্নীত হচ্ছে। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে পেনশনভোগীদের মধ্যে।
৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম নিট পেনশন হবে ১৮ হাজার টাকা। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত: ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এক্ষেত্রে ন্যূনতম নিট পেনশন হবে ৩ হাজার টাকা, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত: ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম নিট পেনশন হবে ৪৯ হাজার টাকা। তবে তা নতুন পে স্কেলের ১নং গ্রেডের অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনের চেয়ে বেশি হবে না। ৪০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব: ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি (ন্যূনতম নিট পেনশন হবে ৬২ হাজার টাকা; ১নং গ্রেডের ঊর্ধ্বসীমা প্রযোজ্য)।
জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, এক গ্রেড এক পেনশন চালু করা গেলে সেটি ভালো হবে। কারণ বর্তমান পদ্ধতিতে আগে অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা এবং একই পদে বর্তমানে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তার মধ্যে পেনশনের টাকা সমান থাকছে না। নতুন পদ্ধতি চালু হলে পুরনো পেনশনভোগীরা নতুনদের সমান উপকার ভোগ করতে পারবেন। এতে পেনশনারদের মধ্যে কোনো বৈষম্য তৈরি হবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, বিশ্বের অনেক দেশে এরই মধ্যে ‘সুনির্দিষ্ট সুবিধাভিত্তিক’ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে ‘সুনির্দিষ্ট চাঁদাভিত্তিক’ ফান্ডেড পেনশনব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৩ সালে শ্রীলঙ্কায় কর্মচারী ৮ এবং সরকার ১২ শতাংশ চাঁদা েদয়। ভারতে চালু হয়েছে কর্মচারীর ১০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের ভিত্তিতে। সেখানে ২০২৫ সাল থেকে ইউপিএস ব্যবস্থার আওতায় আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারী ১০ শতাংশ এবং সরকার ১২ শতাংশ ফান্ডে জমা করছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ায় সুপার-অ্যানুয়েশন পদ্ধতির অধীনে বাধ্যতামূলকভাবে ১২ শতাংশ ফান্ডে জমা করা হয়, যা বিশ্ব জুড়ে অন্যতম সফল মডেল হিসেবে কাজ করছে।
কিন্তু দেশে প্রায় ৯ লাখ অবসরভোগীর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী। অনারোপিত ও সুনির্দিষ্ট সুবিধাভিত্তিক হওয়ায় পেনশনের পুরোটাই পরিশোধ করতে হয় সরকারি রাজস্ব থেকে। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পেনশনভোগী যুক্ত হওয়ায় এবং অবসরপ্রাপ্তদের গড় আয়ু বাড়ায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সুবিধা দিতে গিয়ে বাজেটে তৈরি হচ্ছে তীব্র আর্থিক চাপ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই পেনশন খাতে সরকারের গুনে দিতে হয়েছে ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এই খরচ ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বেড়ে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে।







