সুন্দরবনে বোট লাইসেন্স
সরকার পেল ২ লাখ, বন কর্তাদের ঘুষ ২৩ লাখ
- সরকারি ফি ৩৪.৫০ টাকা, জেলেদের গুনতে হয় ৮০০-১০০০

ফাইল ছবি
টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কেটেছে। খুলে গেছে সুন্দরবনের জলপথ। তবে স্বস্তি ফেরেনি বনজীবীদের। উপার্জনে ফেরার আগেই পকেটে টান পড়েছে তাদের। নৌকা আর জাল সাজিয়ে এসেছিলেন তীরে। আশা ছিল নদী-খালে মাছ ধরে ঘুরে দাঁড়াবেন। কিন্তু শুরুতেই বন কর্মকর্তাদের ঘুষের কোপ। বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়নে সরকারি ফি মাত্র ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাস্তবে জেলেদের মাথাপিছু গুনতে হয়েছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
সরকারি হিসাবে ভ্যাটসহ রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা মাত্র ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮১০ টাকা। অথচ বন কর্মকর্তারা দালালদের মাধ্যমে ঘুষ হিসেবে হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত সাড়ে ২৩ লাখ টাকা। পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বসেছিল এমন ‘ঘুষের হাট’।
উপকূলীয় সাধারণ জেলেরা বনের ওপরই নির্ভরশীল পুরোপুরি। কেউ নদী থেকে ধরেন কাঁকড়া, কেউবা মাছ। পরিমাণে সামান্য হলেও বাড়তি সেই টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই তাদের। বিএলসি নবায়নে শুধু সরকারি ফি দিতে চাইলে মিলেছে হুমকি। অনেককে দেওয়া হয়েছে বন মামলার ভয়। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিয়ে ঘুষের টাকা মিটিয়েছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের আড়ালে সক্রিয় ছিল একটি চিহ্নিত দালালচক্র। বুড়িগোয়ালিনী থেকে কৈখালী— সব স্টেশনেই দালালদের মাধ্যমে তোলা হয়েছে ঘুষের টাকা। এমনকি এই অনিয়ম ধামাচাপা দিতে সাংবাদিকদের খামে করে টাকা পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে।
যদিও বন বিভাগের দায়িত্বশীলরা বরাবরের মতোই দায় এড়িয়েছেন। আর স্টেশন কর্মকর্তাদের দাবি, নির্ধারিত ফির বাইরে নেওয়া হয়নি বাড়তি কোনো টাকা।
জানা গেছে, টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যটক ও জেলে-বাওয়ালিদের জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন। মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করা উপকূলের মানুষের জন্য দিনটি স্বস্তির হওয়ার কথা থাকলেও বনে ঢোকার আগে সরকারি ফির চাইতে ২৫-৩০ গুণ বেশি টাকা গুনতে হয়েছে বনজীবীদের।
বিএলসি নবায়ন নিয়ে সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের কথা হয় সুন্দরবন সংলগ্ন দাঁতিনাখালী এলাকার (নাম বললে সুন্দরবনে ঢুকতে অসুবিধা হবে) এক জেলের সঙ্গে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছ শিকার করে চালান সংসার। ১ সেপ্টেম্বর থেকে মাছ-কাঁকড়া ধরার পাস-পারমিট (মাছ ধরার অনুমতি) দেওয়া শুরু হবে উল্লেখ করে সে সময় তিনি বলছিলেন, নৌকা ও জাল নিয়ে বনে ঢুকবেন। এ কারণে আগেই বন বিভাগ থেকে ধারণক্ষমতা ও নৌকার বিএলসি নবায়ন করতে হয়েছে।
গত ১৭ জুলাই শহিদুল মোল্লা নামে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন থেকে নবায়ন করান বিএলসি।
তার ভাষ্য, কাঁকড়া ধরার জন্য ২০ কুইন্টাল ধারণক্ষমতার নৌকার বিএলসি করতে ভ্যাটসহ সাড়ে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সার বদলে দিতে হয়েছে ১ হাজার টাকা। কিছু টাকা কম দিতে চাইলেও নেয়নি।
হরিনগরের সিংড়তলী এলাকার আরেক বনজীবী বিএলসি করতে জুলাইয়ের শেষ দিকে দালালের মাধ্যমে কদমতলা স্টেশনে গেলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৮০০ টাকা। কিছু টাকা কম দিতে চাইলে তাকে জানানো হয়, কম দিলে হবে না। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়েছেন। শুধু এই দুজন নন, একইভাবে সাতক্ষীরা রেঞ্জের প্রায় ৩ হাজার বনজীবীর কাছ থেকে দালালদের মাধ্যমে বন কর্মকর্তারা আদায় করছেন লাখ লাখ টাকার ঘুষ।
বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা ও কৈখালী স্টেশন এলাকার অন্তত ২০ জেলের অনুমতিপত্রে দেখা গেছে, সেগুলোতে ৪০ টাকার নিচে রাজস্ব নেওয়া হয়েছে বলে লেখা আছে। তবে ওই জেলেদের সবাই জানিয়েছেন, তারা নিজেরা ও দালালদের মাধ্যমে সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন স্টেশনের দায়িত্বরত বন কর্মকর্তাদের দিয়েছেন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে বিএলসি নবায়ন হয়েছে ২ হাজর ৯৩৮টি। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে ১ হাজার ১৬টি, কদমতলা স্টেশন থেকে ৬৫১টি, কৈখালী স্টেশন থেকে ৪০৩টি ও কোবাদক স্টেশন থেকে ৮৬৮টি। যার মধ্যে মাছের ১ হাজার ১৪৯টি, কাঁকড়ার ১ হাজার ৭০০, গোলপাতার ২, প্রমোদ ট্রলার ৭৪, লবণ পানির একটি এবং মধুর বিএলসি ১২টি।
সুন্দরবনের জেলেদের বেশিরভাগ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের নৌকার ধারণক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে ৭৫ মণ পরিমাপের হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে সরকারি হিসাবে নৌকাপ্রতি রাজস্ব দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা। ওই হিসাবে উল্লেখিত ফরেস্ট স্টেশনগুলোর ২ হাজার ৯৩৮টি নৌকার নবায়ন থেকে ভ্যাটসহ রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮১০ টাকা। আর জেলেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌকাপ্রতি নেওয়া হয়েছে ৮০০-১ হাজার টাকা। সে হিসাবে সর্বনিম্ন ৮০০ টাকা করে ধরলেও জেলেদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় হয়েছে অন্তত সাড়ে ২৩ লাখ টাকা।
একাধিক জেলের ভাষ্য, অতিরিক্ত টাকা না দিলে বিএলসি নবায়ন বা নতুন দেওয়া হয় না। উল্টো মামলায় জড়িয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়। যে কারণে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও অভিযোগ জানানোর সাহস পান না।
আগামীর সময়ের প্রশ্নের জবাবে বিএলসি নবায়নে ঘুষ-বাণিজ্যের বিষয়টি স্বীকারও করলেন বন বিভাগের এক স্টেশন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, ‘ঘুষ আদায়ের অভিযোগটি সত্য। তবে এই টাকার ভাগ-বাটোয়ারা বিভিন্ন মহলে চলে যায়। বন কর্মকর্তাদের হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না।’
অবশ্য নিজেদের পক্ষে সাফাইও গাইলেন ওই বন কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, ‘এ অঞ্চলের বনজীবীরা নৌকার বিএলসি নিয়ে দাদন দিয়ে রাখেন। সাতক্ষীরা রেঞ্জে এই সমস্যাটা প্রকট। দাদনের দালালরা বনজীবীদের কাছ থেকে কত টাকা নিল, সেটি আমাদের জানার বিষয় নয়। আমরা বেশি টাকা আদায় করেছি, সেই অভিযোগ কেউ করতে পারবে না। একই সমস্যা শুধু আমার স্টেশনে নেই, পাশের সবগুলো বন স্টেশনেই রয়েছে। দালালদের কারণেই বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে বনজীবীদের, সেজন্য বন কর্মকর্তারা দায়ী নয়।’
যদিও বনজীবীদের অভিযোগ, বিএলসি নবায়নের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করেছে দালালচক্র। তাদের দাবি, বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের পক্ষে ইসমাইল সানা, শহীদুল ইসলাম, হাসান, জালালউদ্দিন ও কানা শহীদুল; কোবাদক স্টেশনের পক্ষে মাসুম ঢালী, লুৎফর রহমান ও রবিউল ইসলাম; কদমতলা স্টেশনের পক্ষে আমজাদ হোসেন, রফিকুল ইসলাম, আককার হোসেন, রফিক, হাফিজুর রহমান ও আবদুল্লাহ মাস্টার এবং কৈখালী স্টেশনের পক্ষে বুলবুলি, আবদুর রহিম, শহীদুল ইসলাম, মহসিন, কামরুল ইসলাম ও আবদুল বারী টাকা আদায়ে যুক্ত ছিলেন।
বনজীবীদের অভিযোগ, স্টেশন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা বা যোগসাজশে এসব ব্যক্তি জেলে-বাওয়ালিদের কাছ থেকে বিএলসি নবায়নের নামে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
বিএলসি নবায়নে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদেরও অর্থ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন জেলের দাবি, গত আগস্টের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের প্রায় ১৩০ জন সাংবাদিককে মাথাপিছু দেওয়া হয়েছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা করে।
নাম প্রকাশ না করতে চাওয়া সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত স্থানীয় একটি দৈনিকের শ্যামনগর উপজেলা প্রতিনিধি বন বিভাগের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করলেন। তার ভাষ্য, গত ৪ আগস্ট দুপুরে একটি মোবাইল ফোন নম্বর থেকে তার মোবাইল ফোনে কল আসে। ফোনের অন্য প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে শ্যামনগর সদরে দেখা করতে বলেন।
ওই সংবাদকর্মী জানিয়েছেন, পরে শ্যামনগর সদরে গিয়ে দেখা করলে বন বিভাগের ওই কর্মী তার হাতে হলুদ রঙের খাম ধরিয়ে দেন। যার ভেতরে ছিল ৩ হাজার টাকা। তাকে বন বিভাগের ওই কর্মকর্তা বললেন, ‘আপনার নামে এটি বরাদ্দ, রেখে দিন।’ এ সময় সেখানে বন বিভাগের আরও একজন কর্মী ছিলেন বলে দাবি ওই সংবাদকর্মীর।
ওই সংবাদকর্মীর ভাষ্য, খামে টাকা দেওয়ার পুরো ঘটনাটি তিনি নিজের মোবাইল ফোনে গোপনে ভিডিও ধারণ করে রেখেছেন। আরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী একইভাবে টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
জানতে চাইলে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদমতলা ও কৈখালী স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা বললেন, শুধু বিএলসি নবায়নের নির্ধারিত ফি ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা দিলেই সব ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া শেষ হয় না। মাছ ও কাঁকড়ার পরিমাণ বা ওজন অনুযায়ী সরকারি অন্যান্য ফি নির্ধারিত হয়। ফলে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সাকে চূড়ান্ত ফি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে দালালচক্র ব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেন এই তিন বন কর্মকর্তা। সাংবাদিকদের অর্থ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি কর্মকর্তারা কৌশলে এড়িয়ে যান।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বললেন, জেলেদের বিএলসি নবায়নে নিয়মে যা আছে, তাই নেওয়ার জন্য প্রতিটি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কারও বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতিতে তিনি এবং ঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তারা জড়িত নন বলে দাবি করেন।






