এমআরআই-সিটি স্ক্যানই নেই ঢাকা শিশু হাসপাতালে
- রোগীদের বাইরে যেতে হয়
- ভোগান্তির সঙ্গে বাড়ে খরচ
- অন্য সরকারি হাসপাতালে এসব সুবিধা আছে
- ‘দালালের’ খপ্পরে পড়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে যান রোগীরা

সংগৃহীত ছবি
ভোলা থেকে মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন এক দম্পতি। গন্তব্য ছিল দেশের সবচেয়ে বড় শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র— রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (ঢাকা শিশু হাসপাতাল)। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে একটি এমআরআই করতে বললেন। কিন্তু সে মুহূর্তেই যেন চিকিৎসার পথ আটকে গেল। কারণ হাসপাতালটিতে এমআরআই করার ব্যবস্থা নেই।
হাসপাতালের একজন কর্মচারীর পরামর্শে তারা গেলেন পাশের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। কয়েক ঘণ্টার দৌড়ঝাঁপ শেষে পরীক্ষা হলো। বিল এলো ৯ হাজার টাকা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে হতাশ কণ্ঠে শিশুটির বাবা আগামীর সময়কে বললেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় শিশু হাসপাতালেও যদি এই পরীক্ষা না হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? টাকা খরচ হলো, আবার এদিক-সেদিক দৌড়াতেও হলো।’
এটি শুধু একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা নয়। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা শত শত পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল দেশের শিশুদের জন্য একমাত্র তৃতীয় স্তরের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবমতে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নেয়; ভর্তি থাকে প্রায় ৬৮১ শিশু। জটিল রোগে আক্রান্ত এসব শিশুর অনেকের ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয় কিংবা চিকিৎসার অগ্রগতি মূল্যায়নে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান অপরিহার্য। অথচ হাসপাতালটিতে আজও এ দুটি পরীক্ষার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ফলে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়েই রোগী ও স্বজনদের বেরিয়ে যেতে হয় হাসপাতালের বাইরে। সেখানেই শুরু হয় আরেক দফা অনিশ্চয়তা, বাড়তি খরচ আর দালালদের দৌরাত্ম্য।
হাসপাতালের ফটক পেরোলেই দালালদের জাল: দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের অনেকের কাছে ঢাকা শহরের মানচিত্র অচেনা। কোথায় পরীক্ষা হবে, কত খরচ হবে, কোন হাসপাতাল ভালো—কিছুই জানা থাকে না তাদের। এই অসহায়ত্বই হয়ে ওঠে একশ্রেণির দালালের মূল পুঁজি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে রোগীদের নির্দিষ্ট কয়েকটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়। বিনিময়ে কমিশন পান সংশ্লিষ্টরা। আবার অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিজেরাই বিপণনকর্মী কিংবা ‘দালাল’ নিয়োগ করে রেখেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই নেটওয়ার্কে কখনো কখনো চিকিৎসকদের একটি অংশও জড়িয়ে পড়ে।
রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘সহায়তা’বা ‘কম খরচে পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার’ আশ্বাস দিয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এরপর রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে।
সরকারি হাসপাতাল পাশেই, তবু গন্তব্য বেসরকারি কেন্দ্র: বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ঠিক বিপরীত পাশেই রয়েছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। সেখানে এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের সুবিধা রয়েছে। খরচও তুলনামূলক অনেক কম।
তবু অধিকাংশ রোগী কেন সেখানে যান না? এ প্রশ্নের উত্তর মিলেছে রোগীদের অভিজ্ঞতায়। গাজীপুরের এক অভিভাবক জন্মের পর থেকেই অটিজম আক্রান্ত ছেলেকে এই হাসপাতালে চিকিৎসা করান। গত ছয় বছরে কয়েকবার তার সন্তানের মস্তিষ্কের এমআরআই করাতে হয়েছে। প্রতিবারই একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করিয়েছেন।
তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বললেন, ‘হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেছিলেন, কম টাকায় পরীক্ষা করিয়ে দেবেন। পরে দেখি, তাকেই আবার ১ হাজার টাকা দিতে হলো।’
আরেক অভিভাবক শুরুতে একইভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করালেও পরে নিজেই সরকারি হাসপাতালের কথা জানতে পারেন। তার ভাষায়, ‘প্রথমে কিছু চিনতাম না। হাসপাতালের এক লোক ৫০০ টাকা নিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে এমআরআই করতে ৮ হাজার টাকা লেগেছিল। এখন পাশের সরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষা ৪ হাজার টাকায় করাই। সময় একটু বেশি লাগে; কিন্তু অর্ধেক খরচে হয়ে যায়।’
সুপারিশের তালিকায় নেই সরকারি হাসপাতাল: এই প্রতিবেদক হাসপাতালের ছয়জন কর্মচারী ও দুজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান কোথায় করানো ভালো। তাদের মধ্যে পাঁচজনই একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম বললেন। কেউ কেউ সেখানে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তাদের কেউই পাশের সরকারি হাসপাতালের নাম বলেননি।
এমন আলাপের মধ্যেই এক কর্মকর্তার কক্ষে আসেন একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিপণন নির্বাহী মো. সাজ্জাদ হালিম। তিনি দাবি করেন, শিশু হাসপাতালের প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর এমআরআই ও সিটি স্ক্যান তাদের প্রতিষ্ঠানেই করা হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসক বা কর্মচারীদের কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়া হয় কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, তুলনামূলক কম খরচে পরীক্ষা করার কারণেই রোগীরা তাদের প্রতিষ্ঠানে যান।
অন্যদিকে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা কমিশনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের ভাষ্য, কোনো আর্থিক সুবিধার কারণে নয়, প্রতিষ্ঠানের সুনামের কারণেই রোগীদের সেখানে যেতে বলা হয়।
যন্ত্র থাকলে রোগীদের এ কষ্ট হতো না: হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলছেন, এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন কেনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় এতদিন তা সম্ভব হয়নি।
তার ভাষ্য, সরকার প্রতি বছর হাসপাতালটিকে ২৮ কোটি টাকা অনুদান দেয়। সম্প্রতি প্রায় ৩৪৪ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন কেনা হবে।
বাংলাদেশে একটি এমআরআই মেশিনের দাম ১২ থেকে ২০ কোটি টাকা। আর একটি সিটি স্ক্যান মেশিন কিনতে প্রয়োজন হয় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা।
পরিচালক বলেছেন, ‘মেশিনগুলো স্থাপন করা গেলে জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা অনেক সহজ হবে। রোগীদের সময় বাঁচবে, খরচও কমবে।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো, হাসপাতাল থেকে মৌখিকভাবে সবসময় পাশের সরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। কেউ ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে যদি অবশেষে এই দুটি সেবা চালু হয়, তাহলে শুধু দুটি যন্ত্রই যুক্ত হবে না; দেশের হাজারো অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার পথ থেকে সরে যাবে একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের অধ্যায়।




