জুতা সেলাইয়ে ৩৫ বছর পার, এখন দিনে আয় ১০০-২০০ টাকা

ছবি: আগামীর সময়
বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড। প্রতিদিন হাজারো মানুষের ব্যস্ত চলাচল। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই যাত্রী ছাউনির এক কোণে বসে থাকেন ৬০ বছর বয়সী স্বপন সরদার। সামনে ছড়িয়ে থাকে জুতা সেলাইয়ের সরঞ্জাম। কারও ছেঁড়া স্যান্ডেল, কারও পুরোনো জুতা—সেলাই আর মেরামত করেই কাটছে তার দিন।
এভাবেই কেটে গেছে জীবনের প্রায় ৩৫ বছর। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে কাজ, কমেছে আয়ও। সারাদিন বসে থেকেও কখনো ১০০, কখনো ২০০ টাকা আয় হয়। সেই সামান্য টাকা দিয়েই পাঁচ সদস্যের সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
স্বপন সরদারের বাড়ি বাগেরহাট শহরের গোবরদিয়া এলাকার মারিয়া খ্রিস্টান পল্লীতে। ছোটবেলা থেকেই জুতার কাজ শিখেছেন। জীবনের বড় একটি সময় এই পেশার ওপর নির্ভর করেই পরিবার চালিয়েছেন। একসময় কাজও ছিল, আয়ও তুলনামূলক ভালো ছিল। এখন মানুষের জুতা মেরামতের কাজ কমে যাওয়ায় আয়ও নেমে এসেছে অনেকটা।
স্বপন সরদার বলেন, ছোটবেলা থেকেই জুতার কাজ শিখেছি। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই কাজ করছি। আগে কাজ বেশি ছিল, আয়ও ভালো হতো। এখন সারাদিন বসে থাকলেও ১০০-২০০ টাকার বেশি আয় হয় না। এই টাকা দিয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো খুব কষ্ট।
অভাবের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করেছেন স্বপন। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে এক ছেলেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়িয়েছেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করেও এখন বেকার। ছোট ছেলেকেও সেলুনের কাজ শেখাতে দিয়েছিলেন। সেও বর্তমানে বেকার।
তিনি বলেন, ছেলেটাকে অনেক কষ্ট করে ইন্টার পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছি। ভেবেছিলাম পড়াশোনা করলে একটা ভালো কাজ করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু এখন সে বেকার। ছোট ছেলেকেও সেলুনের কাজ শিখতে দিয়েছিলাম।
সংসারের টানাপোড়েনের কথা বলতে গিয়ে স্বপনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, আমার যে আয়, তাতে সংসার চলে না। অনেক সময় তিনবেলা খাবারও জোটে না। একবেলা খাই, দুইবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। সবাইকে তো আর বলে বোঝানো যায় না।
তিনি আরোও বলেন, বয়স এখন ৬০-এর ঘরে। শরীরও আগের মতো সায় দেয় না। তবুও সংসারের কথা চিন্তা করে প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ডে এসে বসেন। কারণ জুতা সেলাই ছাড়া অন্য কোনো কাজ তিনি ভালোভাবে জানেন না। এখন তো বয়স হয়ে গেছে। এই বয়সে আর কোথায় গিয়ে কী কাজ করব? অন্য কোনো কাজও করতে পারি না। ছোটবেলা থেকে জুতার কাজই শিখেছি। তাই বাধ্য হয়ে এখনও এই কাজ করে যাচ্ছি।
মুদি দোকানদার বলয় সাহা বলেন, অনেক বছর ধরে তাকে এখানে জুতা সেলাই করতে দেখছি। বয়স হয়ে গেছে, তবুও সংসারের জন্য বসে কাজ করতে হয়। এখনকার বাজারে ১০০-২০০ টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন।
দোকানদার সজিব সাহা বলেন, বাসস্ট্যান্ডে এ ধরনের ছোট কাজ করে যারা জীবিকা চালান, তাদের আয় খুবই কম। স্বপনের মতো বয়স্ক একজন মানুষ এত বছর ধরে কাজ করছেন—বিষয়টি সত্যিই কষ্টের।
স্বপনের পরিবারের সদস্যদের দাবি, বয়সের কারণে এখন তার পক্ষে ভারী কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা অন্য কোনো সহায়তার আওতায় সহযোগিতা পেলে পরিবারের কষ্ট কিছুটা কমতে পারে।
প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো স্বপন বসবেন তার পুরোনো জায়গায়। সামনে থাকবে জুতা সেলাইয়ের সরঞ্জাম, হাতে থাকবে সুই-সুতা। কেউ ছেঁড়া জুতা নিয়ে এলে সেটি মেরামত করবেন। বিনিময়ে মিলবে কয়েক দশক বা কয়েকশ টাকা।
এভাবেই ৩৫ বছর ধরে মানুষের পায়ের জুতা ঠিক করতে করতে নিজের সংসারের ভাঙাচোরা অবস্থাও সামলানোর চেষ্টা করছেন স্বপন সরদার। বয়সের ভার, কমে যাওয়া আয় আর বেকার সন্তান—সব মিলিয়ে তার জীবনের প্রতিটি দিনই এখন নতুন এক সংগ্রাম।



