শেষ ১২ দিনে ‘পাগলাটে’ কাজে যেন নিজেকেও ছাড়িয়ে গেছেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১২ দিনে তার একের পর এক বক্তব্য, ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত জন্ম দিয়েছে ব্যাপক সমালোচনার। সবকিছু ঘটছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে।
এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনে জিতলে অর্থ উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, দুর্যোগ সহায়তা বন্ধের হুমকি, ২০২৪ সালের হত্যাচেষ্টা নিয়ে প্রমাণহীন অভিযোগ এবং হোয়াইট হাউসে জনপ্রিয় কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রবেশ বন্ধের সিদ্ধান্ত। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে ব্যাপক চাপে রয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ডালাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, নভেম্বরে রিপাবলিকানরা কংগ্রেস ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়া হবে। তিনি এটিকে ‘ডিভিডেন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন। প্রস্তাবটির সম্ভাব্য ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।
এ নিয়ে জনমতও মিশ্র। রয়টার্স-ইপসোসের জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের বড় অংশ এই অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে অনুপযুক্ত বলে মনে করেছে।
এর মধ্যেই উত্তর ক্যারোলাইনায় নির্বাচনের ফল নিয়ে দুর্যোগ সহায়তার প্রসঙ্গ তোলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, রাজ্যটি ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত করলে সেখানে দুর্যোগ সহায়তা তহবিল বন্ধ করে দিতে পারেন। পরে তিনি দাবি করেন, কথাটি তিনি মজা করে বলেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকীর আগে ট্রাম্প নিউইয়র্কে ওই হামলার সময় নিজের ভূমিকা নিয়ে একটি গল্প বলেন। তবে সেই বর্ণনার কিছু অংশের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিএনএনের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এরপর ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে তার ওপর চালানো হত্যাচেষ্টা নিয়েও নতুন দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি এটিকে ‘ডেমোক্র্যাটদের ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলও বলেছেন, হামলাকারী থমাস ক্রুকস অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
বিদেশি বাণিজ্য নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি কানাডাসহ দীর্ঘদিনের মিত্র বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বড় অংশের বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, এতে বছরে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার আয় হতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এর পর আসে গণমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত। ১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এসব গণমাধ্যম ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন ওই তিন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কয়েকজনের প্রেস পাসও জব্দ করা হয়।
ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপে তার গণমাধ্যমবিরোধী অবস্থান আবারও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দেওয়া বিচারপতিদের নিয়েও সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বিচারকদের মধ্যে যে কয়েকজনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তারা এখন আর আগের মতো নেই।
এছাড়া আয়ারল্যান্ডের একাত্রীকরণের সম্ভাবনা নিয়েও স্পর্শকাতর মন্তব্য করেছেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে ‘ভাঁওতাবাজি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সব মিলিয়ে গত ১২ দিনে ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের পরিধি বেশ বড়। নির্বাচনের আগে তার নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে যে প্রশ্নগুলো রয়েছে, এসব ঘটনা সেগুলোকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপেও ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে মানুষের সংশয়ের কথা উঠে এসেছে। কিছু জরিপে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বলেছেন, ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথেষ্ট ভেবেচিন্তে নেন না। অনেকে তার মেজাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়েও সংশয় জানিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ নিয়েও বিপুলসংখ্যক মানুষ তার কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ নভেম্বরের নির্বাচনে শুধু কংগ্রেসের আসনই নয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক শক্তিরও পরীক্ষা হবে।
কিন্তু সেই পরীক্ষার আগে ট্রাম্প নিজের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে সংযত হওয়ার বদলে আরও একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন। গত ১২ দিনের ঘটনাপ্রবাহ অন্তত সেই চিত্রই সামনে এনেছে।
সূত্র: সিএনএন




