মানুষের জীবন বাঁচাতে সড়কে শফিকুল

দুর্ঘটনা রোধে সড়কে দায়িত্ব পালন করেন শফিকুল
কোনো বেতন নেই, নেই কোনো সুযোগ-সুবিধা। তবুও প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ব্যস্ত মহাসড়কে দাঁড়িয়ে মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছেন শফিকুল ইসলাম শফি (৫৫)। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিন বছর ধরে স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের আলমপুর ইউনিয়নের খিয়ারজুম্মা এলাকাটি অত্যন্ত ব্যস্ত। প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করায় এ এলাকায় আগে প্রায়ই ঘটত দুর্ঘটনা। চোখের সামনে এসব দুর্ঘটনা ও মানুষের দুর্ভোগ দেখে একসময় মানুষের জীবন রক্ষায় নিজ উদ্যোগে সড়কে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন শফিকুল। এর পর থেকে প্রতিদিন সকাল হলেই লাঠি-বাঁশি নিয়ে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার হতে সহযোগিতা এবং চালকদের সতর্ক করার কাজে নেমে পড়েন তিনি। শফিকুল তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের খিয়ারজুম্মা বাজার এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা এছার উদ্দিন মাহমুদ। পাঁচ সন্তানের জনক শফিকুলের অভাব-অনটনের সংসার।
শফিকুল বললেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে খিয়ারজুম্মা বাজার এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বসে তিনজন চা খেয়েছিলাম। চা খাওয়ার পর আমার সঙ্গে থাকা দুজন রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় নিহত হন। তাদের মৃত্যু আমাকে ব্যথিত করে। এর পর থেকে আমি সড়কের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দাঁড়িয়ে যাই।’
‘আমার তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে ট্রলিচালক। আর ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। বড় ছেলের খরচেই আমাদের সংসার চলছে। আর আমি তো সারা দিন ও গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তায় থাকি’— যোগ করেন শফিকুল।
শফিকুলের বড় ছেলে হাসিনুর ইসলাম বলেছেন, ‘আমার বাবা আগে দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন ওই রাস্তায় যেন দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য দিনরাত কাজ করেন। বাবার মানবিক এ কাজ দেখে আমার ভালোই লাগে।’
শফিকুলের স্ত্রী মোছা. হাসনা বানু বললেন, ‘আমার স্বামী যে মহৎ কাজ করছেন, তাতে আমি গর্বিত। প্রথম দিকে নিষেধ করলেও এখন তাকে নিয়ে আমার গর্ব হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ভাষ্য, ‘শফিকুল নিয়মিত সড়কে দায়িত্ব পালন শুরু করার পর খিয়ারজুম্মা এলাকায় দুর্ঘটনা অনেকটাই কমেছে। ব্যস্ত মহাসড়কে তিনি পথচারীদের সতর্ক করার পাশাপাশি যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করছেন। নিজের সংসার চালাতেই যেখানে শফির কষ্ট হয়, সেখানে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তার এ মানবিক কাজকে সম্মান করি।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য শিপুল ইসলাম বললেন, ‘শফিকুল ওই রাস্তায় দাঁড়ানোর পর থেকে সেখানে দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। সমাজের বিত্তবানরা যদি তাকে সহযোগিতা করতেন, তাহলে তিনি আরও উৎসাহ পেতেন।’
তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজার বলেছেন, ‘শফিকুল আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী নন। তবে শুনেছি, তিনি স্বেচ্ছায় খিয়ারজুম্মা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ঘটনারোধে তিনি যে কাজ করছেন, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।’



