অন্যদের লক্ষ্য অর্জন বাংলাদেশের অংশগ্রহণ

আজ ২০তম এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। চলচ্চিত্র নির্মাতা ইয়ুকিহিকো সুৎসুমির পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবে জাপানি সংস্কৃতির ছোঁয়া। ছবি: এএফপি
তথ্যপ্রযুক্তিতে জাপানের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। দুনিয়া জুড়ে রাজপথে লাখো গাড়ি চলতে দেখেন, তার অধিকাংশই টয়োটা করপোরেশনের। আইচি-নাগোয়াকে অনেকে এই টয়োটার জন্যই চেনে। এ ছাড়া বিমান শিল্পেও আইচি-নাগোয়া বিশ্বে রেখে চলছে বড় ভূমিকা। বিশ্ববিখ্যাত বিমান প্রস্তুতকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের ডানা তৈরি হয় এই নাগোয়ায়। এ ছাড়া শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং নানারকম খাবারের জন্যও প্রসিদ্ধ নাগোয়া। প্রযুক্তি ও শিল্পের এই শহরের ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানও কম নয়। জাপানি সুমো কুস্তিগিরদের কথা কে না জানে। এই আইচি-নাগোয়াকে বলা হয় পেশাদার সুমোর আঁতুড়ঘর। এই টয়োটা, বোয়িং আর সুমোর রাজ্যে আজ পর্দা উঠবে এশিয়ার সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞ এশিয়ান গেমসের।
গেমসের সফল আয়োজনে জাপানের সুনাম বহুদিনের। পাঁচ বছর আগে (২০২১ সালে) রাজধানী টোকিও আয়োজন করে অলিম্পিক গেমসের। আয়োজক হিসেবে আইচি-নাগোয়ার এবার নিজেদের প্রমাণের পালা। যদিও শুরুর আগেই আয়োজন নিয়ে বারবার উঠছে প্রশ্ন। বিশেষ করে প্রায় ১৭ হাজার ক্রীড়াবিদ, অফিসিয়ালের আবাসন নিশ্চিতে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হচ্ছে আয়োজকদের। অপ্রতুল আবাসন এবং এর মান নিয়েও সমালোচনার অন্ত নেই।
আবাসনের বড় চ্যালেঞ্জ উতরে আয়োজকরা একটি সফল গেমস আয়োজন করতে পারবেন কি না, তা আগামী ১৬ দিনে বোঝা যাবে। তবে পদকের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকাদের এসব নিয়ে ভাবার সময় কই? তাদের চোখ সোনার পদকে। সেটা জেতার জন্য তৈরি হয়েই এসেছেন তারা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবশ্য গেমসের উদ্দেশ্য একেবারেই ভিন্ন। বেশিরভাগ খেলাতেই তাদের প্রতিনিধিত্ব শুধুই আনুষ্ঠানিকতার। পদক জয়ের ক্ষুধা নেই কারও মাঝে। নেই সামর্থ্য কিংবা কোনো সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য এবং সেটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।
তাই বরাবরের মতো এবারও ২৬০ সদস্যের বহরের বেশিরভাগের জন্য এটি জাপানের অপরূপ সৌন্দর্য অবগাহন আর আনন্দ ভ্রমণের। গেমসের শুরু-শেষের মার্চপাস্টে পতাকা বহন বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের জন্য গর্ব আর প্রাপ্তির। যে প্রাপ্তিযোগ এবার ঘটতে যাচ্ছে শুটার আব্দুল্লাহ হেল বাকি ও হুমায়রা আক্তার অন্তরার। বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ বহরের নেতৃত্ব দিতে যাওয়া এ দুই ক্রীড়াবিদের কাছে অবশ্য নেই কোনো পদক প্রত্যাশা। তারাও অন্যদের মতো এসেছেন অংশগ্রহণের আনন্দ নিতে। বোনাস হিসেবে জুটেছে পতাকাবাহীর সম্মান।
দিল্লি থেকে নাগোয়া। ৭৫ বছরের এশিয়ান গেমসের পথচলায় সব দেশের উদ্দেশ্যও অবশ্য বাংলাদেশের মতো অংশগ্রহণের অনুষ্ঠানের বৃত্তে আটকে নেই। ছোট-বড় বেশিরভাগই গেমসে আসে কিছু জিতে নিতে। সেটা যে সবসময় পদকই হবে, তা নয়। পদকের বাইরেও জিতে নেওয়ার আছে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব এবং সবকিছু ছাড়িয়ে ভবিষ্যতে ভালো করার জ্বালানি।
চীন, জাপান, কোরিয়া এমনকি পাশের দেশ ভারতের কাছে এই গেমস শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ। যেখানে সবাইকে ছাড়িয়ে যোজন এগিয়ে চীন। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন মার্কিনিদের সমান্তরালে শাসন করা দেশটি এবারও এশিয়াডের অন্যতম ফেভারিট। তবে আয়োজক হিসেবে জাপানও চাইবে চীনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। সব মিলিয়ে আগামী ১৬ দিন নাগোয়া, টোকিও ও ওসাকার ৬৪টি ভেন্যুতে ৪৩টি খেলার ৭১টি ডিসিপ্লিনের ৪৬৯ স্বর্ণপদকের জন্য এশিয়ার ৪৫ দেশের প্রায় ১৫ হাজার ক্রীড়াবিদ লড়বেন।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা নিয়ে বলা আগের কথাগুলো পড়ে হয়তো একেবারেই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন। এই প্রতিবেদককেও হয়তো ভীষণ নেতিবাচক ভাবতে শুরু করছেন। তাদের জন্যই গেমস শুরুর গল্পটার ইতি টানা যাক বাস্তবতা আর প্রত্যাশার সংযোগ ঘটার সম্ভাবনার বার্তা দিয়ে।
১৯৮৬ সিউল গেমসে বক্সার মোশারফের হাত ধরে এসেছিল প্রথম পদক। বাংলাদেশের নাম পদক তালিকায় ওঠার সম্ভাবনা আছে এবারও। বক্সার মোশাররফ যে খাতা খুলে দিয়েছিলেন, সেটা পরে এগিয়ে নিয়েছেন কাবাডি খেলোয়াড়রা। এই গেমস থেকে সর্বোচ্চ সাত পদক এসেছে কাবাডি থেকে। গত দুই আসরে অবশ্য কাবাডি থেকে মেলেনি কিছুই। সে শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে ক্রিকেটে। ২০১০ গুয়াংজু গেমসে যুক্ত হওয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত জিতেছে ছয়টি পদক। প্রথমবারই পুরুষ ক্রিকেটাররা হেসেছিলেন সোনার হাসি। বাংলাদেশের জন্য সেটাই প্রথম, সেটাই শেষ। এরপর ক্রিকেট থেকে নিয়মিত পদক এলেও তার রঙটা কখনো রুপালি কখনো তামাটে। এবারও সব আশার তারা হয়ে জ্বলছে ক্রিকেট। নারী-পুরুষ দুই বিভাগেই আছে পদকের প্রত্যাশা। সে লক্ষ্য পূরণ হলেই দেশের অলিম্পিক কর্তারা তুলতে পারবেন তৃপ্তির ঢেকুর।
ভাগ্যগুণে অন্য কোনো খেলায় যদি কিছু জুটে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। যদিও সে সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। অথচ জেনে রাখুন, নেপালও এখানে এসেছে একাধিক স্বর্ণপদক জয়ের লক্ষ্য নিয়ে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার ক্রীড়াবিদদের লক্ষ্যও এক। ১০৭ পদকে গত আসরে চতুর্থ হওয়া ভারত তো এসেছে নিজেদের অতীত পেছনে ফেলতে।
এশিয়া ছাড়ুন, দক্ষিণ এশিয়ার খেলাধুলায় বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে গেছে, বুঝতে পারছেন তো!



