বিচারিক কর্মকর্তাকে পদায়ন, অস্বস্তিতে জনপ্রশাসন
- একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি
- বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ ও সংস্থায় অন্তত ১৫ কর্মকর্তার পদায়ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) এ কিউ এম নাছির উদ্দিনকে গত বুধবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে সরাসরি পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তিনি সেখানে মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগ দেখভাল করবেন। অথচ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে এ নামে কোনো অনুবিভাগই নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে মতামত ও করণীয় জানতে চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এদিন অন্তত আরও চার বিচারিক কর্মকর্তাকে এ ধরনের পদায়ন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে আরও অন্তত ১০ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে এ ধরনের পদায়ন দেওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে জনপ্রশাসনে। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন স্তরের একাধিক কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে এ ধরনের কোনো নজির নেই। প্রয়োজন হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চাহিদা দেবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পদায়ন হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই। এরকম সরাসরি পদায়নে জনপ্রশাসনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। কর্মকর্তাদের মধ্যে বাড়বে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও হতাশা।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী গতকাল রাতে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমি এখনো এ-সংক্রান্ত চিঠি পাইনি। তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমাদের প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় আইনি সুরাহা করা হবে।’ গত বুধবার আইন মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রজ্ঞাপনে অন্তত পাঁচ বিচারিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পদায়ন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তাদের মধ্যে পটুয়াখালীর বিশেষ জজ আদালতের বিশেষ জজ (জেলা ও দায়রা জজ) মো. গোলাম ফারুককে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু বকর সিদ্দিক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) পদে নিয়োগ পান। ময়মনসিংহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ওয়ায়েজ আল করুনীকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আইন উপদেষ্টা পদে পদায়নের জন্য এবং ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন চৌধুরীকে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পে পদায়নের জন্য আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়।
গতকাল আরও ১০ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পদায়ন করা হয়। সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) স্বপন কুমার সরকারকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আইন উপদেষ্টা পদে; ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মাসুদ আলীকে আইন ও বিচার বিভাগের উপসচিব পদে; পাবনার পারিবারিক আপিল আদালতের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. ফেরদৌস ওয়াহিদকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আইন উপদেষ্টা পদে; আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা সোনিয়া আহমেদকে একই মন্ত্রণালয়ের উপসলিসিটির পদে; পিরোজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইফতেখার আহমেদকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (আইন) পদে; কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসানকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক পদে; আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা আবদুল মোমেনকে (অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা পদে; আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা রাফিয়া সুলতানাকে (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) দুদকের উপপরিচালক পদে; আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা সুব্রত ঘোষ শুভকে একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) পদে এবং মেহেরপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদুর রহমানকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (সিনিয়র সিভিল জজ) পদে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। প্রতিটি প্রজ্ঞাপনে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে’ এসব পদায়ন করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে আইন মন্ত্রণালয়ের এমন পদায়নের বিষয়ে মতামত ও করণীয় জানতে গতকালই জনপ্রশাসন সচিবকে চিঠি দিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে পরবর্তী নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে— আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্য এ কিউ এম নাছির উদ্দীন (আইডি নং ১৯৯৯১১৮০৮), বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ), নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, গাজীপুর-কে অতিরিক্ত সচিব (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ), আইন অনুবিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে সরাসরি বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে।
কিন্তু এ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামোতে এ নামে কোনো অনুবিভাগ নেই। নতুন করে পদ সৃজন এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণাদেশ জারি হওয়া ছাড়া এ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব (আইন অনুবিভাগ) হিসেবে কর্মকর্তা পদায়নের বিধিগত সুযোগ নেই। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ওই কর্মকর্তার পদায়নের বিষয়ে কোনো পত্র পাওয়া যায়নি। নন-সেক্রেটারিয়েট কর্মকর্তাদের কোনো মন্ত্রণালয়/বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়। এ ছাড়া প্রেষণে পদায়নের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদেশ জারি হওয়া বাঞ্ছনীয়।
সরকারের বিভিন্ন পদে বিচারিক কর্মকর্তা পদায়নে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তবে জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশ করে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।
আইন মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আইন না থাকলেও প্রচলিত রীতি আছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ যেকোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, দপ্তর সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে চাহিদা দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের মতামত সাপেক্ষে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এবারের ক্ষেত্রে সেই রীতি মানা হয়নি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘এ পদগুলো জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদ নয়। তাই আইন মন্ত্রণালয় সরাসরি পদায়ন দেওয়া যথাযথ নয়। কোনো মন্ত্রণালয়ের চাহিদা থাকলে ভিন্ন বিষয়। তা ছাড়া মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সঙ্গে বিষয়টি সাংঘর্ষিক কি না, তাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এতে করে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। ব্যাহত হবে কাজ।’
৯৯ বিচারককে বদলি: বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের ৪৪ জেলা ও দায়রা জজ, ২৬ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ২৫ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, দুই সিনিয়র সিভিল জজ, দুই সিভিল জজসহ ৯৯ বিচারককে বদলি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত ছয়টি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
এর মধ্যে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার ১৭ বিচারককে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার কয়েকজন বিচারককে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে আইন-সংক্রান্ত পদে বদলি করা হয়েছে।



