Agamir Somoy E-Paper
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
গরিবের চিকিৎসায় নিবেদিত হাফিজুর
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাহিত্য

বিনয় মজুমদার

কেচ্ছার বাইরে, কবিতার ভেতরে

  • জন্মদিনে স্মরণ
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:১৭
কেচ্ছার বাইরে, কবিতার ভেতরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়

“১৯৮৭-র নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের কোনো একদিন মৃদুলের হাত ধরে অসম্ভব কৌতূহল আর উত্তেজনা নিয়ে কলকাতা মেডিকেল হাসপাতালের এজরা ওয়ার্ডে এই অসামান্য কবিকে দেখতে যাই। খুবই মলিন, প্রায়ান্ধকার, অনেকটাই অপরিচ্ছন্ন এক ছোট্ট বেডে বিনয় মজুমদার, বাংলা কবিতার এক অসামান্য রাজপুত্র বসে আছেন অনেকটাই যেন নিজেকে নাই করে দিয়ে। বড়ো জায়গাটা নিতে পেরেছেন বলেই যেন পার্থিব ছোটো জায়গা নিয়ে ততটা আর মাথা ব্যথা নেই কবির। বিনয় মজুমদারের মতো কবিকে দেখেছি, এই আনন্দ আর প্রাপ্তি বিশাল আমার জীবনে। মৃদুলের সঙ্গে দুয়েকটা কথা হলো, তারপর নিজ মনে বিড়বিড় করলেন অনেকক্ষণ। তা, আমি অবাক তাকিয়ে রইলাম। বিনয় মজুমদার যেদিন চিরপ্রস্থান করেন, সেদিনও আমি কলকাতা ছিলাম। গৌতম আর মৃদুলের বারবার করা অনুরোধের পরও কবির শবানুগমনের ঐ যাত্রায় যেতে মন সায় দেয়নি কেন আজও জানি না। “ফিরে এসো চাকা” আর তার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে মৃদুল আমায় একটু গল্প শুনিয়েছিল সে সময়। সেই গল্প ভাবতে ভাবতে, “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” যে কবি আহমদ আজিজ আমার আগেই সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের রুমে বসে রাত জেগে পড়ে ফেলেছে, এই ঈর্ষায় পোড়ার কথা মনে করতে করতে—কবির, কবিদের অনেকেরই ভয়াবহ জীবনের কথা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে মাথায় আগুন ধরানোর আগেই আমরা আবিষ্কার করি আমরা কলকাতা মেডিকেল হাসপাতালের রাস্তায়। এক-দুদিন পর পত্রিকার পাতায় এই সংবাদটি প্রকাশিত হয়। দীর্ঘকাল পর এই কাটিংটা আমার এক পত্রিকার ভেতর থেকে উদ্ধার করি”। (কবি তুষার দাশের ফেসবুক পোস্ট)

কবি তুষার দাশের সংগ্রহে থাকা পেপার কাটিং থেকে

কবি তুষার দাশের এই স্মৃতিটুকুর পর নিজের আলাপ শুরু করতে মন থির করলাম। আর এই স্মৃতির পাশে আরেকটা ঘটনা। বাংলা ভাষার ঢাকাবাসী তিনকবি তুষার দাশ, ফরিদ কবির আর সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল—তিনজন কবি মিলে গিয়েছিলেন বিনয়কে দেখতে। কী দেখতে গিয়েছিলেন তাঁরা? কবিকে। কিন্তু কবি তখন কাউকে দেখতে চান না। দরজা বন্ধ। কাঁপা হাতে নিজেই তালা খোলেন, সাহায্য নিতে চান না। মিডিয়ার মানুষ দেখলে লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। মাঝে মাঝে ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখেন, কেউ ডাকলে বলেন, “আমি আমার অন্ধকার মায়ের কোলে ন্যাংটো হয়ে শুয়ে আছি, দরজা খুলব না।” সেই দিন কী হয়েছিল, দরজা খুলেছিলেন কিনা, কবিতার বদলে ভাত কিংবা অন্য কিছু খেতে চেয়েছিলেন কিনা—তা জানা যায় না। কিন্তু এই দুই ঘটনাই বিনয় মজুমদারের শেষ জীবনের ছবি। এক কবি, যিনি একসময় বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনার ডাক পেয়েছিলেন, জাপান থেকে মোটা বেতনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন, তিনি শেষ জীবনে দরজা বন্ধ করে বসে আছেন—কারণ “মানুষ সম্পর্কে সন্দেহ এসে গেছে”।

বিনয় মজুমদারকে নিয়ে ইদানীং দুই বাংলাতেই একটা শ্রদ্ধার হাওয়া বইছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: আমরা তাঁকে কবি হিসেবে পড়ছি, না তাঁর জীবনের ব্যতিক্রমী কেচ্ছাগুলোর ধারক হিসেবে? শারীরিক অসুস্থতা, গায়ত্রী-প্রসঙ্গ, মানসিক হাসপাতাল, দেশলাইয়ের আগুন—এসব শুনতে মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু বিনয় সারাজীবন কেচ্ছার উপাদান হতে চাননি; তিনি কবিতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ২৬ বছর বয়সে তিনি ঠিক করেছিলেন, শুধু কবিতাই লিখবেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁকে দারিদ্র্য, একাকীত্ব ও পাগলামির দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু কবিতায় অমর করে। তাই তাঁর জীবনকে দেখতে হবে পুরোটা মিলিয়ে আর শেষে ফিরতে হবে কবিতায়।

বিনয় মজুমদারের জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, বার্মার মিকটিলা জেলার তেজোতে। পিতা বিপিনবিহারী মজুমদার, মাতা বিনোদিনী মজুমদার। ডাক নাম মংটু। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। ১৯৪২-এ জাপানি আক্রমণের ভয়ে পরিবার বার্মা ছাড়ে; পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, গোপালগঞ্জের তারাইল গ্রামে আশ্রয়। ১৯৪৪-এ প্রথম বিভাগে ছাত্রবৃত্তি। ১৯৪৭-এ বৌলতলী হাই ইংলিশ স্কুলে ভর্তি, স্কুল ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা। ১৯৪৮-এ উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগর, শিমুলপুর। ১৯৪৯-এ কলকাতা মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন। ১৯৫২-তে মেট্রিক। ১৯৫৩-তে প্রেসিডেন্সি থেকে আই.এসসি প্রথম বিভাগ। ১৯৫৭-তে শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বি.ই.। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম। শোনা যায়, তাঁর পাওয়া নম্বর আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। বউবাজারে থাকাকালীন রুশ ভাষা শেখেন ওলসা গুসেফারের কাছে; রুশ থেকেও অনুবাদ করেন।

বিনয় মজুমদারের শ্রেষ্ঠ কবিতা বইয়ের প্রচ্ছদ

কিন্তু চাকরিতে মন বসেনি। দুর্গাপুর স্টিল প্রজেক্টে ট্রেনি, হস্টেলের রুম নম্বর চার। সরকারি চাকরি, সকাল আটটায় পৌঁছতে হয়, মাইনে কম; কলকাতার কবিতার জগৎ থেকে দূরে। বাবা-দাদা চান সরকারি চাকরিতেই থাকুন—পেনশন, ভবিষ্যৎ, বিয়ে। বাবা ১৯৬২-র ৯ জুন লিখছেন, ট্রেনিং শেষ হলেই বিয়ে দেবেন, ৩২৫ টাকায় চলবে। দাদা ১৪ জুন লিখছেন, প্রাইভেট ফার্মের জন্য যে তেল মারার ক্ষমতা দরকার, তা তাঁর নেই। এমনকি কলকাতায় কয়েকদিন থাকতে চাইলেও দাদা জানান, বৌদি থাকবে তাই থাকা সম্ভব নয়। এই চিঠিগুলো তাঁর উদাসীন, অস্থির, মিতভাষী স্বভাবের পাশাপাশি একাকীত্বকেও চেনায়।

কবিতায় প্রথম বই ‘নক্ষত্রের আলোয়’। কোনো পত্রিকায় লেখা প্রকাশের আগেই বই বেরিয়েছিল— ‘গ্রন্থজগৎ’-এর দেবকুমার বসু পাণ্ডুলিপি পড়ে নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেন। পরে ‘ফিরে এসো চাকা’, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। ৪০১টি ‘এক পঙক্তির কবিতা’। গণিত নিয়ে গবেষণা-গ্রন্থও লিখেছেন—Geometrical Analysis, Unital Analysis ইত্যাদি। কবিতা ও গণিত—দুটোকে আলাদা দ্বীপ করে রাখেননি। তাঁর ডায়েরিতে এক পাতায় অঙ্ক, অন্য পাতায় কবিতার খসড়া; কোন কবিতা কোথায় পাঠিয়েছেন, তার হিসেব; বাবার ও শক্তির চিঠি।

প্রেম-জীবনও কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে। শিবপুরে পড়া বিনয়ের প্রেম গায়ত্রী চক্রবর্তীতে—প্রেসিডেন্সির ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম শ্রেণির প্রথম, পরে কর্নেল থেকে এমএ, ‘Can the Subaltern Speak?’-এর তাত্ত্বিক। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ফিরে এসো চাকা’-র চাকা মানে চক্রবর্তী, মানে গায়ত্রী। গায়ত্রী আমেরিকায় গেলেন, বিয়ে করলেন, নাম হল গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। বিনয় আর বিয়ে করেননি, চাকরি করেননি। অর্থাভাবে জীবন মরুভূমি হয়ে গেল, বলেছেন তিনি। অথচ তারুণ্যে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন থেকে গণিতের অধ্যাপনা, জাপান থেকে মোটা বেতনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডাক পেয়েছিলেন; তিনি জানতেন না, বা চাননি। শোনা যায়, প্রথম জীবনে বিনয়ের এক সহপাঠীর বোন শ্যামলী ঘোষের সঙ্গে প্রেম ছিল; জাতিগত কারণে বিয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

ফিরে এসো চাকা বইয়ের প্রচ্ছদ

‘ফিরে এসো চাকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যায় কেন তিনি বাংলা কবিতায় ব্যতিক্রম। ‘৮ মার্চ ১৯৬০’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: “একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে / দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে / পুনরায় ডুবে গেলো—এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে / বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হ’লো ফল। / বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে, / যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে / রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ।” এই কবিতায় প্রকৃতি আর মানুষের শরীর একাকার। কবি Nature-কে মানুষের সমান মর্যাদা দেন, আর natural body-কে কবিতার উপাদান করেন। এই Body-ecology-text সংযোগ বিনয়ের কবিতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। একই কবিতায় তিনি আরও লিখেছেন: “তুমি বৃক্ষ, জ্ঞানহীন, মরণের ক্লিষ্ট সমাচার জানো না, / এখন তবে স্বর শোনো, অবহিত হও। / সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কতো বেশি বিপদসঙ্কুল / তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ, / এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে সঞ্চারিত হ’তে চাই।”

‘কবিতা বুঝিনি আমি’-তে তিনি স্বীকার করেন অজ্ঞানতাকে: “কবিতা বুঝিনি আমি; অন্ধকারে একটি জোনাকি / যৎসামান্য আলো দেয়, নিরুত্তাপ, কোমল আলোক। / এই অন্ধকারে এই দৃষ্টিগম্য আকাশের পারে / অধিক নীলাভ সেই প্রকৃত আকাশ প’ড়ে আছে— / এই বোধ সুগভীরে কখন আকৃষ্ট ক’রে নিয়ে / যুগ যুগ আমাদের অগ্রসর হয়ে যেতে বলে, / তারকা, জোনাকি—সব।” এই অজ্ঞানতাই কবিতার সার; তিনি জানেন না, কিন্তু খুঁজে যান। তিনি লিখেছেন: “এই অজ্ঞানতা এই কবিতায়, রক্তে মিশে আছে / মৃদু লবণের মতো, প্রশান্তির আহ্বানের মতো।”

‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’-র স্বাদ ভিন্ন এক জগতের। ‘অঘ্রাণ’ মানে শীতের আগমনীকাল, আর সেই শীতে শালবনের ফুলের গন্ধ, জীবনের নিষ্পেষণ, মানসিক হাসপাতালে থাকার অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে যায়। বিনয় এখানে লিখেছেন: “আমার সচেতনতা যেন অতিচেতনার সমপরিমাণ হয়ে যায় / উভয় চেতনা যেন সমান কুশলী হয় / সমান সক্ষম হয়ে যায়।” এখানেই তাঁর কবিতার গভীরতম স্তর—স্বাভাবিক চেতনা আর অস্বাভাবিক চেতনার সীমারেখা মুছে যাওয়া।

আর ‘এক পঙক্তির কবিতা’—মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রচিত ৪০১টি এক-পঙক্তির কবিতা। ‘যা ঘটে তাই স্বাভাবিক’, ‘সবচেয়ে বোকা প্রাণী মাছ’, ‘সবচেয়ে ভালো জ্যামিতি ময়ূরের পেখমে’, ‘শরীরের তুলনায় প্রজাপতির পাখনা কত বড়’—এই এক-পঙক্তির ভিতরে তিনি ধরে রাখেন প্রাকৃতিক সত্য ও বিস্ময়। তারাশঙ্কর-পরবর্তী বাংলা কবিতায় এমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বিরল। তিনি পণ্ডিতদের বিবৃতি অনুযায়ী মানসিক অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু হাসপাতালে লেখা এই কবিতাগুলো পড়লে মনে হয় না এগুলোর কোনোটি পাগলপ্রলাপ। বরং এগুলো যেন জীবনের প্রতি অনাসক্ত এক দ্রষ্টার বিপরীত আয়নায় দেখা জগৎ।

‘আমরা দুজনে মিলে’ কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেমের বেদনা ধরা পড়ে। কবি লিখেছেন: “তুমি আর হিন্দু নেই, খ্রিস্টান হয়েছো। / তুমি আর আমি কিন্তু দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছি। / আমার মাথার চুল যেরকম ছোটো করে ছেঁটেছি এখন / তোমার মাথার চুলও সেইরূপ ছোটো করে ছাঁটা, / ছবিতে দেখেছি আমি দৈনিক পত্রিকাতেই; যখন দুজনে / যুবতী ও যুবক ছিলাম / তখন কি জানতাম বুড়ো হয়ে যাব? / ... / আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে, / তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে, / চিঠি লিখব না। / আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।” এই লাইনগুলোই তাঁর প্রেম, ক্ষতি ও কবিতার সম্পর্কের সারাংশ। ব্যক্তিগত জীবন পুড়ে গেছে, কিন্তু বইয়ের পাতায় দুজনে একত্রে আছেন।

জীবনের আরেক দিক ভয়ংকর। মশারীর ভেতরে শুয়ে বিড়ি খেতে খেতে দেশলাই দিয়ে মশারীতেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি; আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরে। সেই আগুন সম্পর্কে বলতেন, হাঙরের অত্যাচার সহ্য করতে পারছিলেন না। আটবারের কাছাকাছি মানসিক হাসপাতালে গেছেন। ৩০ থেকে ৩১ বার মাথায় ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছে। তবু বলতেন, এতকিছুর পরেও আমি সুস্থ চিন্তা করতে পারি; নিজেকে পাগল মনে করি না; কেউ পাগল বললে খারাপ লাগে। হাসপাতালে বসে মহকুমা শাসককে চিঠি লিখেছেন—বাড়ির লোক না চাইলেও তিনি বাড়ি ফিরতে চান। বাড়ি ফিরে আত্মীয়দের কাছ থেকে মানসিক রোগীর যোগ্য সহানুভূতি পাননি। এক সময় ঠিক করেছিলেন দেশ ছাড়বেন, ধর্ম ছাড়বেন, ইসলাম নেবেন। পাসপোর্ট ছাড়াই পালিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। তারপর নিজেই থানায় হাজির হয়ে বললেন, পাসপোর্ট-ভিসা নেই, কিন্তু এদেশের নাগরিক হতে চান। আটক হয়ে হাজতে ঢোকেন, পরে বনগাঁ সীমান্তে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, থানায় তাঁর বাম চোখ ও বাম কান নষ্ট করে দেওয়া হয়। এই ঘটনা তাঁর জীবনের আরেক সর্বনাশ।

এহসান হায়দার সম্পাদিত এক আশ্চর্য ফুল বিনয় মজুমদার সংকলনের প্রচ্ছদ

শেষ জীবনে মানুষ সম্পর্কে সন্দেহ এসেছিল। সহজে মেশা যেত না। কাঁপা হাতে নিজের ঘরের তালা খুলতেন, সাহায্য নিতেন না। মিডিয়ার মানুষ দেখলে লাঠি নিয়ে তাড়া করতেন। মাঝে মাঝে ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখতেন; কেউ ডাকলে বলতেন, “আমি আমার অন্ধকার মায়ের কোলে ন্যাংটো হয়ে শুয়ে আছি, দরজা খুলব না।” এমন সময় আকাশবাণী থেকে তাঁকে কবিতা পড়তে নেয়ার পরিকল্পনা হয়। তিনি তখন তীব্র মিডিয়াবিমুখ। তাই চিহ্ন আড়াল করে গাড়ি পাঠানো হয়, ঠাকুরনগর থেকে কলকাতায় আনা হয় চোখের ডাক্তার দেখানোর নাম করে। আকাশবাণীর গেট দেখেই তিনি রেগে যান। কোনোমতে তাঁকে রেকর্ডিং কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি স্বমহিমায় ফিরে আসেন; বিরোধ কেটে যায় কবিতার পাঠে। পড়তে পড়তে বলেন, খিদে পেয়েছে। ক্যান্টিন থেকে খাবার আনা হয়। পরে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যদি এভাবে ভাত খেতে দাও, আবার আসব কবিতা পড়তে। কবিতার বদলে তিনি চেয়েছিলেন শুধু ভাত—এই কথাটি তাঁর জীবন ও ক্ষুধার নিবৃত্তি নিয়ে করুণ বাস্তবতার চিত্র।

তাঁর কবিতার ভাষা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, জীবনানন্দের ছায়া। কিন্তু জীবনানন্দের অনিশ্চিতের বহুমুখী বিস্তার আর বিনয়ের সিদ্ধান্তমুখী, সীমায়িত ভাষা এক নয়। বিনয় কবিতায় ইউনিভার্সাল ট্রুথ তৈরি করতে চেয়েছেন; সেখানে কখনো প্রবাহ ধীর হয়েছে। ‘মানুষ নিকটে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়’—এই ‘প্রকৃত’ বিশেষণটি প্রশ্নযোগ্য। ধরা পড়া সারস অপ্রকৃত কেন? বেঁচে থাকার সংগ্রাম করা সারসের সত্য কোথায়? ইউনিভার্সাল ট্রুথ বলে কিছু হয় না; সত্যের একাধিক অবস্থান থাকে। এই সমালোচনা সত্ত্বেও বিনয়ের স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করা যায় না। তিনি ছিলেন বাংলা কবিতার এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠ, যিনি ‘শূন্য’কেই কবিতা বানিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন, শূন্যতা কখনও কখনও পূর্ণতার চেয়ে বেশি বাস্তব।

বিনয় মজুমদার (১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ – ১১ ডিসেম্বর ২০০৬)। ছবি: প্রতিকৃতি অবলম্বনে আগামীর সময় গ্রাফিকস
পুরস্কার পেতে শুরু করেন দেরিতে। ১৯৯৫ কবিতীর্থ, ১৯৯৬ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি, ১৯৯৯ যামিনীভূষণ ও পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন, ২০০০ সারা বাংলা কবিতা উৎসব, ২০০৩ ভারত ভাষাভূষণ, ২০০৫ রবীন্দ্র পুরস্কার ও সাহিত্য আকাদেমি। ২০০৬-এর ১১ ডিসেম্বর শিমুলপুরের বিনোদিনী কুঠীতে মৃত্যু। তাঁর গ্রন্থের তালিকা দীর্ঘ— ‘নক্ষত্রের আলোয়’, ‘গায়ত্রীকে’, ‘ফিরে এসো চাকা’, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, ‘বাল্মীকির কবিতা’, ‘এক পঙক্তির কবিতা’, ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’, ‘ধূসর জীবনানন্দ’। ইংরেজি অ্যান্থলজিতেও তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে। ‘ধূসর জীবনানন্দ’-এ তিনি স্বীকার করেছেন, প্রাণপণে জীবনানন্দের কবিতা নকল করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বুঝেছিলেন, “জীবনানন্দের কবিতা নকল করার মতো ক্ষমতা আমার নেই।” এই স্বীকারোক্তিতেই তাঁর স্বকীয়তার শুরু।

বিনয় মজুমদার অবহেলিত ছিলেন, আবার বিখ্যাতও। এই দ্বন্দ্বই তাঁর জীবন। তিনি অর্থহীন গণিত লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন, হাসপাতালে ৩১টা শক খেয়েছেন, প্রেমে হেরেছেন, দেশ ছেড়েছেন, আবার ফিরেছেন। কিন্তু সব ছাপিয়ে তিনি বাংলা কবিতায় এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠ। তাঁর জীবনী কেচ্ছার তালিকা নয়; তাঁর কবিতা পড়ার আহ্বান।

‘ফিরে এসো চাকা’ পড়তে পড়তে বুড়ো হয়ে মরে যাওয়া যায়—এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা জানেন, বিনয়ের সত্য কেবল তাঁর শারীরিক অসুস্থতায় বা গায়ত্রীর নামে নয়; তাঁর সত্য ওই কবিতার পঙ্ক্তিতে, যেখানে ভাষা চিন্তা হয়ে ওঠে, আর জীবন মরুভূমি হয়েও ফোটায় ফুল, কবির জীবন এমনই আশ্চর্য হয়।

বিনয় মজুমদার
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    বিদেশি ফার্নিচার ও কর্মকর্তাদের সম্মানী নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

    বিদেশি ফার্নিচার ও কর্মকর্তাদের সম্মানী নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

    ‘হেসে কথা বলল, পরদিন শুনি আইসিইউতে’

    ‘হেসে কথা বলল, পরদিন শুনি আইসিইউতে’

    বদলে যাচ্ছে জাতীয় ক্রিকেট লিগ

    বদলে যাচ্ছে জাতীয় ক্রিকেট লিগ

    গ্যাসে সাময়িক স্বস্তি, বেড়েছে লোডশেডিং

    গ্যাসে সাময়িক স্বস্তি, বেড়েছে লোডশেডিং

    গেটে জং ধরা তালা, কাঁটাতার সরিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমপি

    গেটে জং ধরা তালা, কাঁটাতার সরিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমপি

    নিগারের ঘোষণায় অস্থিরতা তারপরও ক্রিকেটে চোখ

    নিগারের ঘোষণায় অস্থিরতা তারপরও ক্রিকেটে চোখ

    পলাতক কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য পাচারে ২০০ পুলিশ!

    পলাতক কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য পাচারে ২০০ পুলিশ!

    হামের ধকল থেকে অপুষ্টির কবলে ৭ মাসের আয়ান

    হামের ধকল থেকে অপুষ্টির কবলে ৭ মাসের আয়ান

    গ্যাস বাড়তেই শিল্পে উৎপাদন ৭০ শতাংশ

    গ্যাস বাড়তেই শিল্পে উৎপাদন ৭০ শতাংশ

    গরিবের চিকিৎসায় নিবেদিত হাফিজুর

    গরিবের চিকিৎসায় নিবেদিত হাফিজুর

    ১০ লাখ কোটির রূপরেখা

    ১০ লাখ কোটির রূপরেখা

    জিপিএ ৫ পেয়েও কলেজে মনোনয়ন পায়নি ২২০৫ শিক্ষার্থী

    জিপিএ ৫ পেয়েও কলেজে মনোনয়ন পায়নি ২২০৫ শিক্ষার্থী

    নিউ ইয়র্ক সফর সংক্ষিপ্ত করছেন তারেক রহমান, নিচ্ছেন না সংবর্ধনা

    নিউ ইয়র্ক সফর সংক্ষিপ্ত করছেন তারেক রহমান, নিচ্ছেন না সংবর্ধনা

    ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে দূতাবাস চালু করবে মরক্কো

    ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে দূতাবাস চালু করবে মরক্কো

    সিনিয়রের সামনে সিগারেট জ্বালানোয় তানিমকে হত্যা করা হয়

    সিনিয়রের সামনে সিগারেট জ্বালানোয় তানিমকে হত্যা করা হয়