হামের ধকল থেকে অপুষ্টির কবলে ৭ মাসের আয়ান
- স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিয়ে সংশয়
- মার্চ থেকে হামে ১০৪৪, ডেঙ্গুতে আরও ৭ মৃত্যু

হাম নিয়ে টানা এক মাস হাসপাতালে থাকার পর ছুটি মিলেছে আয়ান ইসলামের। সাত মাসের আয়ান বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিল উচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র শ্বাসকষ্ট আর কাশি নিয়ে। শিশুটির প্রথম ১৫ দিন কেটেছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। যেখানে কয়েক দফা ‘যমে-ডাক্তারে’ টানাটানি শেষে কিছুটা উন্নতি হয়েছে তার। তবে পুরো সুস্থ হয়নি এখনো।
আয়ানের মা সানজানা আক্তার (১৭) জানাল, আয়ানের এখনো থেমে থেমে জ্বর আসে। খাবার খেতে পারে না। ওজন সাড়ে ছয় কেজি থেকে কমে চার কেজিতে নেমেছে। তার বুকে, প্রস্রাবে এবং রক্তে সংক্রমণের অবস্থার খুব একটা উন্নতি দেখা যায়নি। তারপরও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে।
সানজানা বলছিল, প্রতিদিনই অসংখ্য হামের রোগী আসছে হাসপাতালে। তাদের মধ্যে কারও কারও অবস্থা বেশি খারাপ। এসব রোগীকে ভর্তি সুবিধা দিতে আয়ানকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। তবে অসুস্থতা বাড়লেই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছেন চিকিৎসকরা। এ কারণে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী উপজেলার রামচর না গিয়ে হাসপাতালের পাশেই ভাড়া নিয়েছেন বাসা। সেখানে এখন ছেলের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের লড়াই করতে হচ্ছে তাকে।
আয়ান হাসপাতাল ছাড়ার আগেই সপ্তাহের শুরুতে শিশু হাসপাতালে হামের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট আয়ানের হাড় জিরজিরে শরীরে বাড়তি তাপ। কিশোরী মা কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিচ্ছেন। চিঁচিঁ করে কান্না করছে সে। শরীরের তুলনায় মাথাটা বড়। দেখেই বোঝা যায়, শিশুটি তীব্র অপুষ্টির শিকার।
আয়ানের মা আক্ষেপ করে বলছিল, ‘হামে ভুগে ভুগে আমার ছেলে এখন অপুষ্টির খাতায় পড়ে গেছে। ডাক্তার বলেছেন পরানে বাঁচলেও আয়ানের ঠিকঠাক শারীরিক-মানসিক বিকাশ নাও হতে পারে। আয়ানের কী হবে ভেবে রাতে ঘুমাতে পারি না।’
গা মোছা শেষ করে ছেলের খাবার বানাতে বানাতে সানজানা জানাল, গত জুলাইয়ে ঢাকার রামপুরায় নানুর বাসায় বেড়াতে এসে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় আয়ান। এরপর ভর্তি করা হয় আইসিডিডিআর,বির কলেরা হাসপাতালে। সেখানে তিন দিন থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসে। এরপর আক্রান্ত হয় নিউমোনিয়ায়। তখন ভর্তি করা হয় সেগুনবাগিচার বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ (মা ও শিশু)-এ। সেখানে প্রথম তিন দিন ছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। এরপর কেবিনে এলে দেখা যায় ছোট্ট আয়ানের মাথা-শরীর জুড়ে র্যাশ। চিকিৎসক হাম বলে সন্দেহ করেন। আয়ানকে রেফার করা হয় শিশু হাসপাতালে। সিট না থাকায় এক দিন থাকেন পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। এরপর এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দুপুর ১২টার দিকে আয়ানের মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এ সময় আয়ানের দাদি হাসিনা বেগম মেঝেতে বসে নাশতা খাচ্ছিলেন। ছেলের বউ নাশতা খেতে রাজি হচ্ছিল না বলে কিছুটা বিরক্ত তিনি। হাসিনা বলছিলেন, ‘নিজে (সানজানা) খাওয়া-দাওয়া করে না। তাই ছেলেকে বুকের দুধও খাওয়াতে পারেনি।’
তিনি জানালেন, আয়ান মাত্র ১ মাস ২০ দিন মায়ের বুকের দুধ খেতে পেরেছে। তারপর থেকে খাচ্ছে বাজারের কৌটার দুধ।
এ সময় পাশের শয্যা থেকে এক রোগীর স্বজন বলে ওঠেন, ‘মা-ই শিশু, শিশুর যত্ন নেবে কীভাবে!’ সানজানার ১৫ পার হওয়ার পরই প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়। বয়স কম থাকায় এখনো বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হয়নি। বিয়ের বছর যেতেই সন্তানের মা হন। এখন অসুস্থ সন্তানের জন্য রাত জেগে জেগে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত এই কিশোরী। মা-ছেলের সংগ্রামময় জীবনের জন্য বাল্যবিয়েকে দায়ী মনে হয় সানজানার। তার শাশুড়িও একমত। ছোট ছেলের বিয়ের জন্য কম বয়সী মেয়ে আনবেন না বলে জানালেন তিনি।
আয়ানের সাত মাস বয়সের তিন মাসই হাসপাতালে কেটেছে। এখনো হামের টিকা দেওয়ার সুযোগ হয়নি। অবশ্য হাসপাতাল থেকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো হয়েছে। মা হামের টিকা দিয়েছিলেন কি না, তাও বলতে পারেননি এই কিশোরী।
সানজানা জানাল, আয়ানের চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ৭ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এখনো রোজ ৩ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে। এরপর বউ-শাশুড়ির শারীরিক ধকল তো আছেই। তবু তারা চান, ছোট্ট আয়ান তাদের কোল জুড়ে থাকবে। গুটি গুটি পায়ে উঠানময় ঘুরে বেড়াবে। আধো বোলে ডেকে উঠবে ‘মা’।
হামে আক্রান্ত হয়ে আয়ানের মতো লাখো শিশু প্রাণে বেঁচে গেলেও ভুগছে নানা জটিলতায়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম নিয়ে এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মৃত্যুসংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে ছুটছে আরও বড় সংখ্যার দিকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৪৪ জন মারা গেছে। মৃতের বেশিরভাগই শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৮ জন। এ ছাড়া চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১৭১ জন। এর মধ্যে নারী ৮৯। ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৭ জন, হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৭৫৩।



