সৌদি থেকে জ্বালানি তেল আমদানি
৮০০ কোটি টাকার তেল আনার খরচই ২১৭ কোটি

অপরিশোধিত তেল- সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনার দুটি সহজ পথ- হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ। ফলে সুয়েজ খাল হয়ে নতুন ও জটিল রুটে তেল আনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এ পথে একসঙ্গে দুই মহাদেশ ও দুই মহাসাগর পাড়ি দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ এই সমুদ্রপথে এক লাখ টন তেল জাহাজে করে চট্টগ্রামে আনতে শুধু পরিবহন খরচই পড়ছে ২১৭ কোটি টাকা। যেখানে তেল কিনতেই খরচ হয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।
সহজ ও স্বাভাবিক রুট বন্ধ থাকায় সৌদি আরব থেকে তেল আমদানি করতে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। একদিকে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন খরচও কয়েক গুণ বেড়েছে। তেল আনতে সময়ও লাগছে বেশি, বেড়েছে ঝুঁকি। এত চ্যালেঞ্জ ও বিপুল পরিবহন ব্যয় করে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ কতদিন তেল আমদানি করতে পারবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাত মাস ধরে হরমুজ প্রণালির সহজ রুট দিয়ে তেল আসা বন্ধ। জুলাইয়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিকল্প হিসেবে বাব এল-মান্দেব প্রণালিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ওই মাসেই বাংলাদেশ নতুন বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া ও আফ্রিকা ঘুরে তেল আনা শুরু করে। এতে শুধু পরিবহন খরচই পড়ছে ২১৭ কোটি টাকা। তেল কেনার চেয়ে পরিবহন ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) বেশি চাপে ফেলছে। এ অবস্থায় নতুন ও সহজ বিকল্প উৎসের খোঁজ করছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান।
দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড চারটি দেশের অপরিশোধিত তেল শোধনের উপযোগিতা পরীক্ষা করেছে। দেশগুলো হলো নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়া।
ইস্টার্ন রিফাইনারি নাইজেরিয়ার ‘বনি ক্রুড’, মালয়েশিয়ার ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড’, নরওয়ের ‘আলভহেইম ব্লেন্ড’ এবং আলজেরিয়ার অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেছে। রিফাইনারির প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিকল্প উৎসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অপরিশোধিত তেল আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম।
তিনি বললেন, ‘চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত হয়তো আরও ১১ হাজার কোটি টাকা এ খাতে ব্যয় হতে পারে। এটা সরকারের আমদানি ব্যয়ের ওপর একটি চাপ। তবুও সরকার জনগণের প্রয়োজনে এই চাপ নিচ্ছে।’
সরকার বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এই তেল পরিশোধন করা হয়। পরে বিপিসির অধীন সংস্থাগুলো তা বাজারজাত করে। বার্ষিক জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো থেকে ৮ লাখ টন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডনক থেকে ৭ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে সরকার। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে সৌদি আরব থেকে তেল আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এডনক থেকে তেল আমদানি সচল থাকলেও যুদ্ধের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
বিপিসির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সরকারের মোট খরচ হয়েছিল সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক লাখ টন তেল আমদানিতে মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রামে তেল আনতে সাধারণত লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি হয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে ১৩ থেকে ১৬ দিন সময় লাগে। তবে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক রুট পরিবর্তন করে এবার জাহাজটিকে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালি, আটলান্টিক মহাসাগর, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ, ভারত মহাসাগর ও শ্রীলঙ্কা ঘুরে আসতে হয়েছে। এতে জাহাজটিকে প্রায় ১৩ হাজার নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সময় লেগেছে মোট ৫০ দিন।
দীর্ঘ এই রুটে এক লাখ টন তেল আনতে মোট খরচ হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেল কেনার দাম প্রায় ৮০০ কোটি টাকা এবং পরিবহন খরচ ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় এক লাখ টন তেল আমদানিতে খরচ বেড়েছে ২০০ কোটি টাকার বেশি।
বিপিসির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন করে সরকারি আরেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বললেন, ‘ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ শুরুর পর বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে এই তেল আনতে খরচ হতো ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এবার লাগছে ১৬ মিলিয়ন ডলার বা ২০০ কোটি টাকা। এখন এই রুটে নতুন করে তেল আনবে কি না, সে সিদ্ধান্ত বিপিসির।’



