হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় সন্তান প্রসব, ঘটনাটি নোয়াখালীর নয় নেপালের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘টাকা না দেওয়ায় নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে এক মা রাস্তায় সন্তান প্রসব করেছেন’—এমন দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্ট বিভ্রান্তিকর। পোস্টে ব্যবহৃত ছবির ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়, নেপালের।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টটি নজরে আসার পর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) রাজীব আহমেদ চৌধুরী সুধারাম মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তার দাবি, পোস্টে ব্যবহৃত ছবি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের নয় এবং প্রকৃত ঘটনা ও স্থান যাচাই না করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
জিডিতে রাজীব আহমেদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, মঙ্গলবার সকালে নিজের ফেসবুক আইডি ব্যবহারের সময় একটি ফেসবুক আইডিতে ওই পোস্ট দেখতে পান। পোস্টে দুটি ছবি দিয়ে দাবি করা হয়, নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালে টাকা না দেওয়ায় এক মাকে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে বিষয়টি যাচাই করা হলে দেখা যায়, পোস্টে ব্যবহৃত ছবিগুলো ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল এলাকার নয়। ভিন্ন স্থানের ছবি ব্যবহার করে নোয়াখালী হাসপাতালের ঘটনা হিসেবে তথ্যটি প্রচার করা হয়েছে বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়।
জিডিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের তথ্য প্রচারের ফলে হাসপাতালের সুনাম, ভাবমূর্তি ও জনআস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ওই ফেসবুক আইডির পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও পোস্টটির প্রকৃত উৎস শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছে।
সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম জিডি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযোগটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যে ঘটনা নেপালে ঘটেছে
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর সঙ্গে নেপালের একটি ঘটনার মিল রয়েছে। নেপালের সপ্তরী জেলার রাজবিরাজে অবস্থিত গজেন্দ্র নারায়ণ সিংহ হাসপাতালে ঘটনাটি ঘটে।
নেপালের ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ৩০ বছর বয়সী ববিতা কুমারী পাসওয়ান প্রসবব্যথা নিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর রাতে ওই হাসপাতালে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী হরেরাম পাসওয়ান ও এক প্রতিবেশী। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ববিতার রক্ত পরীক্ষা করানোর জন্য একটি স্লিপ দেওয়া হয়।
হরেরামের দাবি, পরীক্ষাগুলোর জন্য প্রায় ৩ হাজার ২০০ নেপালি রুপি প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছিল। তাঁদের কাছে ছিল ২ হাজার রুপি। বাকি টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি। পরে রাতের দিকে দম্পতি হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ববিতার প্রসবব্যথা তীব্র হলে কয়েকজন নারীর সহযোগিতায় হাসপাতালের বাইরের ফুটপাতে তিনি একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ববিতা ও তাঁর নবজাতককে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে ফিরিয়ে নেয়। সেখানে তাঁদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মা ও নবজাতক দুজনের অবস্থাই স্বাভাবিক ছিল।
এ ঘটনায় নেপালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নেপাল মেডিকেল কাউন্সিল পৃথক তদন্ত দল পাঠায়। সপ্তরী জেলা প্রশাসনও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি, হাসপাতালের সেবা এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোয়াখালীর হাসপাতালের ঘটনা হিসেবে যে ছবি ও তথ্য ছড়ানো হয়েছে, তার সঙ্গে নোয়াখালীর কোনো ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি। ছবিগুলো নেপালের রাজবিরাজে হাসপাতালের বাইরে সন্তান প্রসবের ঘটনার। তাই নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ঘটনা হিসেবে প্রচারিত দাবিটি বিভ্রান্তিকর।



