প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি

উদ্ধার করা বন্যপ্রাণী হস্তান্তর করছেন রবি কস্তা
বন্যপ্রাণী বিপদে পড়লে অস্বাভাবিক চিৎকার ও আচরণ করে। সেই সংকেত বুঝে ছুটে যান জঙ্গলে। শুরু করেন উদ্ধার তৎপরতা। এভাবেই প্রায় ২ হাজার ৬০০ বন্যপ্রাণীকে নতুন জীবন দিয়েছেন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার দাঁড়াগাঁও এলাকার রবি কস্তা (৪০)। বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি নিয়ে এ কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে নিজের বসতভিটাকেই পরিণত করেছেন বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্রে।
শিকারিদের হাতে আহত, আটকে পড়া, ঝড়ের কবলে পড়ে আহত মায়া হরিণ, বানর, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, বনরুই, গন্ধগোকুল, চিতাবিড়াল, মেছোবিড়াল, বনমোরগসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী উদ্ধার করেছেন তিনি।
শুরুটা ২০০০ সালে। বাবা-মা চা-বাগানে পাতা তোলার কাজে ব্যস্ত থাকলে ছোট্ট রবি চলে যেত পাশের জঙ্গলে। পাখির ডাক ও বুনো প্রাণীর আনাগোনা তাকে টানত গভীর বনে। কখনো পশুপাখির ডাক শুনে কাছে গিয়ে পথ হারিয়েছে, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছে তাদের সঙ্গে। সে সময়েই বনের প্রাণীদের সঙ্গে তৈরি হয় তার মায়ার বন্ধন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই মমতা হয়েছে আরও গভীর।
প্রথমদিকে পাহাড়-জঙ্গলে আহত প্রাণীদের তাৎক্ষণিক সেবা দিয়ে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিতেন রবি। ২০১১ সাল থেকে আহত ও অসুস্থ প্রাণীদের নিজ বাড়িতে নিয়ে পরিচর্যা শুরু করেন। সুস্থ করে ফেরান প্রকৃতির কোলে। গত ১৫ বছরে সাপ, পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২ হাজার ৬০০ প্রাণী উদ্ধারের তথ্য দিয়েছেন তিনি।
সর্বশেষ উদ্ধার করা একটি দাঁড়াশ ও একটি পদ্মগোখড়া সাপ করছেন পরিচর্যা। লোকালয়ে বিষধর সাপ ঢুকে পড়লেও খবর পেয়ে ছুটে যান রবি। পিটিয়ে হত্যার হাত থেকে সাপ উদ্ধার করে তুলে দেন বন বিভাগের কাছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের হবিগঞ্জ রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলেছেন, বাড়িঘর থেকে সাপ উদ্ধার করতে গেলে অনেকে রবিকে টাকা দিতে চান। তবে তিনি তা নেননি। কেউ জোর করে দিলে সেই অর্থ নিজের জন্য ব্যয় না করে তা দিয়ে বন্যপ্রাণীর ওষুধ ও খাবার কেনেন।
চা-শ্রমিক দিলীপ কস্তার একমাত্র সন্তান রবি কস্তা। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসার তার। বসবাস করেন দাঁড়াগাঁও এলাকার চা বাগানে।
এত প্রাণী উদ্ধারের পরও বাহবা বা স্বীকৃতির আক্ষেপ নেই রবির। তার ভাষায়, ‘কোনো বন্যপ্রাণী বিপদের মুখে পড়লে আমি অস্থির হয়ে যাই। ওদের চিৎকার শুনলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। গভীর রাত হলেও আঁতকে উঠি। কখনো ছুটে গিয়ে দেখি, শিকারির আঘাতে কোনো প্রাণী কাতরাচ্ছে। তখন আর কিছু ভাবি না, উদ্ধার করে নিয়ে আসি।’
রবি বলছিলেন— ‘আমি চাই, প্রাণী আর মানুষের মধ্যে মমতার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠুক। মানুষ যেন ভয় বা আতঙ্ক থেকে প্রাণীকে হত্যা না করে, বরং তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে, এটা যেন বুঝতে শেখে।’



