ডাকসুতে ঢুকে জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর করলেন সাবেক শিক্ষার্থী

সংস্কার শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর যে ছবি রাখা হয়েছিল, তা ছিঁড়ে ফেলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী।
আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের সাবেক এই শিক্ষার্থী আজ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণাধীন ডাকসুর উদ্যোগে সংগ্রহশালায় তোলা জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিল ছাত্রদলও।
এদিকে ছবি ছেঁড়ার ঘটনাটিকে ‘হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সংগ্রহশালার দায়িত্বে থাকা ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে ডাকসুর কর্তৃত্বে আসে ছাত্রশিবির। তাদের উদ্যোগে ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কার শেষে গতকাল রবিবার খোলা হয়।
তখন দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবি ঠাঁই না পেলেও নতুন যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি।
তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে আজ সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব ডাকসুর সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর ছবি দেয়াল থেকে নামিয়ে ভেঙে ফেলেন। পরে ফ্রেম থেকে সেই ছবি বের করে ছিঁড়ে ফেলেন।
আবু তৈয়ব তখন বলছিলেন, ‘জিন্নাহর এই ছবিটা ডাকসু কেন টানিয়েছে? সাদিক কায়েম (ডাকসুর ভিপি), তোমরা কি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাও?
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে না, উর্দু হবে, এই ঘোষণা দেওয়া জিন্নাহর ছবি রাখার সাহস করেছে এই ডাকসু। এই ডাকসু যা মন চায়, তা করছে। ইতিহাসের খলনায়ক, বাঙালি হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড, তিনি কার্জন হলে এসেছিলেন, স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন উর্দু হবে রাষ্ট্র ভাষা।’
আবু তৈয়ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ডাকসু নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী ছিলেন তিনি। প্রার্থীদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বয়সী হিসেবে তিনি আলোচিত ছিলেন।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জিন্নাহ। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার প্রতিবাদ উঠেছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্ত ঝরাতে হয়েছিল বাঙালিকে।
জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে মারা গিয়েছিলেন। তবে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের শোষণ-নিপীড়ন থামেনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্থান দেওয়ার বিরোধী জিন্নাহর ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় রাখার প্রতিবাদ জানিয়ে রবিবারই বিবৃতি দেয় ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল।
সংগঠনটির নেতারা আজ ডাকসুর সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে ফেলার দাবি জানায়। নইলে কর্মসূচির হুমকিও দেন ছাত্রদল নেতারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ডাকসুর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, এমন একটি সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে ডাকসুর ঐতিহাসিক অবস্থানকে বিতর্কিত করা হয়েছে।
এদিকে, জিন্নাহর ছবি ছিড়ে ফেলার পরপরই ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ডাকসু সংগ্রহশালায় হামলা করে ছবি ভাংচুর করা হয়েছে।’
পরে জিন্নাহর ছবিগুলোর সময়কাল, প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আরেকটি পোস্ট দেন তিনি।
সেখানে জুমা লেখেন, জিন্নাহর একটি ছবি আসলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়কার পেপার কাটিং। ওই দিনের সংবাদে জিন্নাহকে নিয়ে প্রতিবেদন ছিল। জিন্নাহর দ্বিতীয় ছবিটি ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়কার। তৃতীয় ছবিটি জিন্নাহর ঢাকায় সমাবেশের। আর সেই সমাবেশে জিন্নাহর বক্তব্যের পর যে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম শুরু, তা ছবির ক্যাপশনেই লেখা ছিল।





