বিশ্ববাজারে ফের জ্বালানি তেল সংকটের শঙ্কা
- হরমুজে নতুন হামলা বা মজুদ ফুরালে বাড়তে পারে দাম

মধ্যপ্রাচ্যে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে। তবে যুদ্ধ শুরুর সময় যে ধরনের বড় তেল সংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল, এখনো তা দেখা দেয়নি। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প সরবরাহ পথ, বিভিন্ন দেশের মজুদ তেল এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এই ভারসাম্য বেশ নড়বড়ে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে মজুদ কমে যাওয়া, বিকল্প সরবরাহ পথের সক্ষমতা সীমায় পৌঁছানো এবং হরমুজ ঘিরে নতুন হামলার ঝুঁকি তেলের বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে। খবর সিএনএনের।
জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, মূলত তিন কারণে যুদ্ধের ধাক্কা সামলে নিয়েছে তেলের বাজার। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠাচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক পাহারায় হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন সচল রাখছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। তবে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক বিজয়ের পর বিকল্প সরবরাহ পথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কানেভার ভাষায়, তেলের ব্যারেল শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পথ খুঁজে নেয়।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ মজুদ থেকে প্রত্যাশার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে। ফলে জরুরি সময়ে বাজারে সরবরাহ করার মতো মজুদ এখনো রয়েছে। তৃতীয়ত, যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বাড়ি থেকে কাজের প্রবণতা এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও চীনের শোধনাগার সক্ষমতার ঘাটতিও অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমিয়েছে।
যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমলেও চাহিদা কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল। বিকল্প সরবরাহ ও মজুদের ব্যবহার মিলিয়ে তৈরি হয়েছে সাময়িক ভারসাম্য।
বর্তমান বাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মজুদ। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার কুশিংয়ে তেলের মজুদ গত জুলাইয়ে পরিচালনাগতভাবে ন্যূনতম পর্যায়ে নেমেছিল। পরে কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে আবার চাপ তৈরি হতে পারে। চীনের সরকারি মজুদের প্রকৃত পরিমাণ জানা না গেলেও দেশটির হাতে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসাইনের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে একপর্যায়ে এসব মজুদও কমে আসবে। তখন সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম শেষ পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ ডলারে স্থিতিশীল হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলে তা নেমে আসতে পারে ৬৪ ডলারে। তবে র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালির পূর্বাভাস, আগামী বছর ব্রেন্টের দাম প্রায় ৮৯ ডলার হতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের পূর্বাভাস, আগামী বছরের শেষ নাগাদও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরবে না। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, বিকল্প সরবরাহ, মজুদ ও সামরিক সহায়তার ওপর চাপ তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত মজুদ ফুরিয়ে গেলে বা হরমুজ ঘিরে বড় ধরনের হামলা হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।



