ডেঙ্গুতে ৪ গুণ বেশি মৃত্যুঝুঁকি অন্তঃসত্ত্বার, শঙ্কায় অনাগত শিশুও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিয়ে হয়েছিল গত বছরের ১৬ অক্টোবর। চলতি মাসেই ঘর আলো করে আসার কথা ছিল নতুন অতিথির। কিন্তু বিবাহবার্ষিকী উদযাপন বা সন্তানের মুখ দেখা— কোনোটাই হলো না ২৬ বছর বয়সী অর্পিতা দাশের। ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে মারা যান তিনি। মায়ের মৃত্যুর পরই জন্ম হয় মৃত পুত্রসন্তানের। অর্পিতার এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি তুলে ধরছে ডেঙ্গু সংক্রমণে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহতা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষ ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হলেও নারীদের মৃত্যুহার বেশি। চলতি বছরে মশাবাহিত এ রোগে মারা গেছেন ১৪৩ জন, এর মধ্যে নারী ৭৩ জন। তবে এখানো আলাদাভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ডেঙ্গু আক্রান্ত বা মৃত্যুর হিসাব রাখা হয়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তঃসত্ত্বা নারীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কয়েক গুণ বেশি। মায়ের পাশাপাশি অনাগত সন্তানেরও শারীরিক নানান জটিলতার পাশাপাশি হতে পারে মৃত্যুও।
‘গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু সংক্রমণে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু না হওয়া অন্তঃসত্ত্বা নারীদের তুলনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪ দশমিক ১৪ গুণ বেশি। এর পাশাপাশি মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি ২ দশমিক ৭১ গুণ এবং নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি ৩ দশমিক ০৩ গুণ বেশি। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হেলথ’ জার্নালে প্রকাশিত এ গবেষণায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৯ হাজার ৬৩২ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। প্রাথমিকভাবে বাসায় মশার কামড় থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সুরক্ষিত রাখতে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বর হলেই সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দিলেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ তার।
গবেষণাটির তথ্য-উপাত্তে আরও দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের হার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সময়ের আগে সন্তান জন্মের হার ১৪ শতাংশ, মাতৃ রক্তক্ষরণের হার ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, গর্ভপাতের হার ৬ শতাংশ এবং মৃত সন্তান প্রসবের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান। বললেন, ডেঙ্গুতে চমেক হাসপাতালে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। তবে সেটা হাসপাতালের রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনের পর তালিকায় যুক্ত হবে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর ডেঙ্গু হলে শুরু থেকে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রাখা জরুরি। এতে গুরুতর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
সাদিকুন নাহার দিলরুবা ১০ দিন ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। উচ্চমাত্রার জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে দুই দফা হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। আড়াই মাসের এ অন্তঃসত্ত্বা নারীর প্লেটলেট কমে নেমেছে ৯৭ হাজারে। এর সঙ্গে শরীর জুড়ে ভয়ানক চুলকানিতে পারছেন না ঘুমাতে।
৩২ বছর বয়সী এই নারী বলছিলেন, ‘কয়েক দিনের ডেঙ্গুতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। কতবার যে মনে হয়েছে, এবার মরেই যাব। তখন সাড়ে চার বছরের মেয়েটার কথা ভেবে আরও বেশি কষ্ট হয়েছে, চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরেছে।’
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ছাবিকুন নাহার জানালেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এমনিতেই নারীদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। আবার অন্তঃসত্ত্বা থাকায় ওষুধে রয়েছে অনেক বিধিনিষেধ। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে নানান ধরনের জটিলতা বেড়ে যায়, তাতে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অনাগত শিশুর জীবন পড়ে ঝুঁকিতে।
অন্তঃসত্ত্বা ডেঙ্গু রোগী মাঝেমধ্যেই পান বলে জানালেন এই চিকিৎসক। বললেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ডেঙ্গু হলে রক্তচাপ কমে যাওয়া, ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্স হতে পারে। আবার গর্ভপাত এবং ডেলিভারির সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত থাকলে রক্তক্ষরণ বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০ হাজার ২৭৬ জন। ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৫৬ জন। মারা গেছেন ২ জন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার আগামীর সময়কে বলেছেন, সারা দেশে এডিস মশার লার্ভা ডেঙ্গু ছড়ানোর উপযোগী মাত্রা ব্রুটো ইনডেক্স-২০-এর ওপরে। এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক হলো এই ব্রুটো ইনডেক্স। যেখানেই এডিস মশার লার্ভা এবং ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হবে, সেখানেই মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিলেন এই কীটতত্ত্ববিদ।



