সৌদি-হুতি যুদ্ধে পাকিস্তান কেন দৃশ্যপটে

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তেহরানে স্বাগত জানাচ্ছেন ইরানের আব্বাস আরাঘচি। ফাইল ছবি : রয়টার্স
ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রধান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে। একই রাতে আরাঘচি কথা বলেছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের। আবার ইরানের সঙ্গেও সীমান্ত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখতে হয় ইসলামাবাদকে। তাই প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান কি সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়ে সামরিক পথে যাবে, নাকি দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করবে?
দ্রুত এগোচ্ছে হুতিরা
গত কয়েক দিনে ইয়েমেনে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। মঙ্গলবার সৌদি আরবের চারটি শহরে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন। কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনাতেও আগুন লেগেছে।
এরপর বৃহস্পতিবার হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে। তারা উপকূলের আরও দক্ষিণে এগিয়ে যায়। শুক্রবারের মধ্যে লোহিত সাগরের পুরো উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে ধুবাব এবং প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপেও হুতিদের যোদ্ধারা পৌঁছেছেন।
তবে হুতিদের পক্ষ থেকে এখনো প্রণালিটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
তারপরও এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।
কারণ, বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালে যাওয়া যায়। ফলে এ পথের ওপর চাপ তৈরি হলে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের সামনে দুই দিকের চাপ
সৌদি আরবের সমস্যা আরও বড় হয়েছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব।
হরমুজে ইরান যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল এরই মধ্যে মারাত্মকভাবে কমেছে। আর ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাব আল-মান্দাবকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
সৌদি আরব সম্প্রতি হরমুজ এড়িয়ে তেল পাঠাতে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপরও নির্ভর করছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরে পাঠানো যায়।
বৃহস্পতিবার পাইপলাইনের একটি অংশে আগুন দেখা গেলেও সৌদি আরব এখনো হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
অর্থাৎ, সৌদি আরব এখন শুধু সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে নয়, তেল রপ্তানির নিরাপত্তা নিয়েও চাপের মধ্যে আছে।
পাকিস্তানের ওপর চাপ কেন বাড়ছে
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও হয়েছে। চুক্তির মূল কথা হলো, কোনো সদস্যের ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে।
বুধবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে আরও ছড়িয়ে পড়লে এই চুক্তি কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু এক দিনের মধ্যেই ইসলামাবাদের ভাষা অনেকটা নরম হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবের হয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
এখানেই পাকিস্তানের কৌশলটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
ইসলামাবাদ সৌদি আরবকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতেও যেতে চায় না।
তেহরানে আসিম মুনিরের যোগাযোগ
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এপ্রিলের পর চারবার ইরান সফর করেছেন। সর্বশেষ সফর হয়েছে গত মাসে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পাকিস্তানকে ইরানের ওপর প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এখন হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত বাড়ার পর মুনির ও আরাঘচির মধ্যে ফোনালাপ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জওহর সালিম মনে করেন, ইসলামাবাদ হয়তো এবার সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে চাইছে।
কারণ, পাকিস্তানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে দুই পক্ষকে আলোচনায় ফেরানো অনেক নিরাপদ পথ।
পাকিস্তান আগেও এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে
ইয়েমেন নিয়ে পাকিস্তানের এই দ্বিধা নতুন নয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তানের কাছে সেনা, জাহাজ ও যুদ্ধবিমান চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের পার্লামেন্ট তখন সর্বসম্মতভাবে যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
তাদের যুক্তি ছিল, নিরপেক্ষ থাকলেই পাকিস্তান শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে এবার ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, পাকিস্তান এখন সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা চুক্তি কি মানেই যুদ্ধে নামা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেই যে সৌদির ওপর হামলা হলেই পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে নেমে যাবে, বিষয়টি এত সরল নয়।
ইরানি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেছেন, চুক্তির অর্থ কী হবে, সেটি পরিস্থিতি অনুযায়ী দুই পক্ষ ঠিক করবে।
এর একটি উদাহরণও আছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ইরান সৌদি আরবে সরাসরি হামলা চালানোর পর এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি সেনা সৌদি আরবে পৌঁছেছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি।
অর্থাৎ, সামরিক সহায়তা আর সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়।
ইরান কতটা হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে
পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে ইরানের ওপর।
ইরান হুতিদের সমর্থন করে। তবে তেহরান প্রকাশ্যে বলে আসছে, হুতিরা তাদের ‘প্রক্সি’ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের ওপর ইরানের যথেষ্ট প্রভাব আছে। কিন্তু সেই প্রভাব সীমাহীন নয়। হুতিরা নিজেদের সিদ্ধান্তও নেয়।
তারপরও কৌশলগতভাবে দুই পক্ষের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে এক।
সাম্প্রতিক হুতি সাফল্যের পর ইরানের নেতাদের বক্তব্যেও সেটি স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ হুতিদের সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবারও হুতিদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।
পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত কী করবে
এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সামনে মূলত তিনটি পথ।
প্রথমত, সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা ও প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়া, কিন্তু যুদ্ধে সরাসরি না জড়ানো।
তৃতীয়ত, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে মধ্যস্থতা করে সংঘাত থামানোর চেষ্টা করা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃতীয় পথটিই পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি মনে করেন, সৌদি আরবের হুতি-হুমকি মোকাবিলায় পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা আছে। তবে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জওহর সালিমের মতে, এই মুহূর্তে সৌদি আরবের পাকিস্তানকে যুদ্ধে নামানোর প্রয়োজন নেই। বরং যুদ্ধ ঠেকাতে পাকিস্তান বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে।
আসল পরীক্ষা এখন
তবে সময় যত গড়াবে, পাকিস্তানের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া তত কঠিন হবে।
হুতিরা যদি সৌদি আরবের আরও ভেতরে হামলা চালায়, তখন রিয়াদের সামরিক সহায়তার দাবি জোরালো হতে পারে। আর পাকিস্তান যদি তখনও নীরব থাকে, সৌদি আরবের সঙ্গে তার নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
আবার পাকিস্তান যদি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, তাহলে ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্ক বড় ধাক্কা খেতে পারে। পাকিস্তানের নিজের সীমান্তও ইরানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
রিয়াদের কিং ফয়সাল সেন্টারের বিশ্লেষক উমের করিমের ভাষায়, পাকিস্তানের নিষ্ক্রিয় থাকার খরচ বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদকে সৌদি আরবের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার পূরণের জন্য কোনো না কোনো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
তাই আসল প্রশ্ন এখন পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে যাবে কি না, সেটি নয়। বরং কতটা যাবে, আর কতক্ষণ কূটনীতির পথ ধরে রাখতে পারবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
কারণ পাকিস্তানের সামনে এখন এমন এক সমীকরণ, যেখানে সৌদির নিরাপত্তা রক্ষা করতে গিয়ে ইরানকে শত্রু বানানোও যাবে না। আবার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে সৌদি আরবকেও হতাশ করা যাবে না।
সূত্র : আলজাজিরা








