লোডশেডিং
পাবনা-সিরাজগঞ্জে তাঁতশিল্পে ধস, কর্মহীন লাখো শ্রমিক
- দৈনিক চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং
- তেলের দামের সঙ্গে বেড়েছে লোকসান
- দুই থেকে আড়াই লাখ তাঁতে স্থবিরতা
- কারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকার লাখো শ্রমিক

ফাইল ছবি
পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। পরিধি বাড়তে বাড়তে এখান থেকেই মিলছিল প্রায় ১৫ লাখ মানুষের রুটি-রুজি। কান পাতলেই দুই জেলার বাতাসে পাওয়া যায় খটখট শব্দ। কিন্তু ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে সেই আওয়াজ। ঘন ঘন লোডশেডিং, সুতা ও রঙের অতিরিক্ত দাম এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো শিল্প। লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে বহু বিদ্যুৎচালিত (পাওয়ারলুম) ও চিত্তরঞ্জন (সেমি অটোমেটিক) তাঁত। এতে কাজ হারিয়ে বেকার লাখো ক্ষুদ্র তাঁতি ও শ্রমিক।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের স্থানীয় বেসিক সেন্টারগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা। দুই জেলায় বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন তাঁতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর ওপর নির্ভরশীল ১২ থেকে ১৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। এ অঞ্চলে উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গি দেশের বিপুল চাহিদা মিটিয়ে হতো রপ্তানি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পূর্ণ বদলে গেছে পরিস্থিতি। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় ও বাজারে উৎপাদিত পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। স্থানীয় তাঁতী সমিতিগুলোর তথ্য মতে, দুই জেলায় মোট সাড়ে চার লাখ তাঁতের মধ্যে দুই থেকে আড়াই লাখ (৫০-৬০ শতাংশ) পুরোপুরি বন্ধ বা আংশিক নিষ্ক্রিয়।
তাঁতশিল্প মালিকরা জানালেন, প্রতিটি বিদ্যুৎচালিত তাঁতে সুতা তৈরি, রঙ করা, শুকানো, নলি ভরা ও কাপড় বোনার জন্য গড়ে তিন থেকে চারজন শ্রমিক প্রয়োজন। সব মিলিয়ে এ খাতের ওপর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিং ও লোকসানের কারণে কারখানায় ঝুলছে তালা।
‘ত্রিমুখী সংকটে এরই মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কারখানা বন্ধ। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোও লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের সুযোগ হারিয়ে বর্তমানে জেলা দুটির প্রায় পৌনে দুই থেকে দুই লাখ তাঁতশ্রমিক কর্মহীন। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রিকশা-ভ্যান চালানো কিংবা দিনমজুরির মতো বিকল্প পেশায় ভিড়ছেন অনেকে’— উল্লেখ করলেন বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ড ও স্থানীয় তাঁতী সমিতির কর্মকর্তারা।
পাবনার কুলুনিয়া গ্রামের তাঁত মালিক সৈয়দ আলী ও দোগাছী গ্রামের আবু জাফরের আক্ষেপ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালানো ছাড়া উপায় থাকে না। তবে বাজারে ডিজেলের সংকট ও চড়া দামের কারণে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, যা সরাসরি যোগ হচ্ছে লোকসানের খাতায়। এতে অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে কাপড় তৈরির উৎপাদন খরচ।
‘সুতা, রঙ, সোডা অ্যাসিডসহ সব উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। ৫০ কাউন্টের এক বেল সুতা এক বছর আগের ১৪ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২০০ টাকায়। কাঁচামালের দামের বিপরীতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব’— দুরবস্থা তুলে ধরলেন একই গ্রামের সুতা ব্যবসায়ী কামাল ব্যাপারী ও ডায়িং মালিক দবির উদ্দিন।
উৎপাদন কমে যাওয়ার চরম ধাক্কা লেগেছে শ্রমিকের মজুরিতে। সাঁথিয়ার তাঁতশ্রমিক আবুল হোসেন, রহম আলী ও মগরেব আলী জানালেন, আগে যেখানে দিনে তিন থেকে চারটি লুঙ্গির থান বোনা যেত, বিদ্যুৎ না থাকায় এখন সারা দিনে দুটি থান তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে আগে যেখানে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় হতো, তা এখন নেমে এসেছে ১ থেকে দেড় হাজার টাকায়।
শাহজাদপুর হাটের পাইকারি বিক্রেতারা জানালেন, অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণে কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আর্থিক মন্দার প্রভাবে বেচাকেনায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। রংপুর, ঢাকা বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আগে প্রতি হাটে চার থেকে আট ট্রাক কাপড় কিনতেন, এখন নিচ্ছেন এক থেকে দুই ট্রাক।
পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও আতাইকুলা হাটে সপ্তাহে কয়েকশ কোটি টাকা লেনদেন হতো। দেশের নানা প্রান্তের পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে শাড়ি-লুঙ্গি কিনতেন। স্থানীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্তমানে কাপড় বিক্রি, রপ্তানি ও ব্যাংক লেনদেন কমেছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
‘স্বাভাবিক সময়ে এ অঞ্চলের প্রধান হাটগুলোতে সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাপড় কেনাবেচা ও ব্যাংক লেনদেন হতো। বর্তমানে তা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকায় নেমেছে’— যোগ করলেন ব্যবসায়ীরা।
বেড়া উপজেলা তাঁতী সমিতির সভাপতি আবদুল গফুর এবং হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বললেন, তাঁতিদের একদিকে বিদ্যুতের ন্যূনতম বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে চড়া দামে ডিজেল কিনে চালাতে হচ্ছে জেনারেটর। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা না দিলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও উদ্ভূত সংকটের বিষয়ে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার আহমেদ শাহ আল জাবেরের আশ্বাস, তাঁতশিল্প অধ্যুষিত এ এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ চাহিদা ৭৪ মেগাওয়াট, তার বিপরীতে সর্বোচ্চ পাওয়া যাচ্ছে ৬১ মেগাওয়াট। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অসুবিধার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী সারা দেশে রেশনিং করে লোডশেডিং ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তও হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হবে।



