নারায়ণগঞ্জের আদমজী
বাংলার গাউনে সাজছেন পশ্চিমা কনেরা
- রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি, ইতালিসহ ৩৭ দেশে
- চলতি অর্থবছরের শুরুতেই বিক্রি ৭ লাখ ডলারের পণ্য
- গাউনের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ভেইল বোলেরো

ইউরোপ-আমেরিকার বিয়ের অনুষ্ঠানে লম্বা সাদা গাউন পরা নববধূর ছবি সিনেমা বা টেলিভিশনের পর্দায় পরিচিত দৃশ্য। ঝলমলে পুঁতি, পাথর, লেস ও জরি বসানো এসব গাউন কনের সাজে যোগ করে আলাদা সৌন্দর্য। তবে সেই চোখধাঁধানো পোশাকের একটি অংশ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) একটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের নববধূদের সেই স্বপ্নের পোশাক।
কারখানাটির নাম ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড। এখানে শুধু বিয়ের গাউন নয়, তৈরি হচ্ছে বিয়ের ঘোমটা (ভেইল), বোলেরো (এক ধরনের জ্যাকেট), বিয়ের গয়না এবং বিভিন্ন ধরনের সন্ধ্যাকালীন পোশাকও। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা এসব পোশাক রপ্তানি হচ্ছে জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশে।
কারখানার তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউবিএফ ব্রাইডাল ৫২ লাখ ৬৬ হাজার ৭৯৮ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই রপ্তানি হয়েছে ৭ লাখ ১২ হাজার ৪১২ ডলারের পণ্য। এবার প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য রপ্তানি ৮০ থেকে ৯০ লাখ ডলারে উন্নীত করা।
রপ্তানির এই অঙ্কের পেছনে রয়েছে বেশ শ্রমসাধ্য একটি উৎপাদন প্রক্রিয়া। সাদা কাপড়ের ওপর নিখুঁতভাবে পুঁতি, পাথর, লেস ও জরি বসিয়ে গাউনকে আকর্ষণীয় করে তোলেন শ্রমিকরা। কারও হাতে তৈরি হয় নকশা, কেউ মেশিনে কাপড় কাটেন। অন্যরা ব্যস্ত থাকেন মান যাচাই ও প্যাকেজিংয়ে। একটি গাউন তৈরিতে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘণ্টা। বিয়ের গাউন সাধারণ পোশাকের মতো শুধু মাপ ও সেলাইয়ের বিষয় নয়; নকশা, অলংকরণ ও ফিনিশিংয়ের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা। আর এই দক্ষ শ্রমিক তৈরি করাই শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
২০১৯ সালে টঙ্গীতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে ইউবিএফ ব্রাইডাল। বিশেষায়িত এই পোশাক তৈরিতে দক্ষ শ্রমিকের সংকট থাকায় শুরুতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। পরে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সুবিধা নিতে ২০২২ সালে কারখানাটি স্থানান্তর করা হয় আদমজী ইপিজেডে। বর্তমানে পাঁচতলা ভবনের এই কারখানায় রয়েছে আটটি উৎপাদন লাইন। প্রতিটি লাইনে কাজ করেন ২৩ জন করে শ্রমিক। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৩৫৭ জন স্থানীয় শ্রমিক। বিদেশি কোনো কর্মী নেই। বিশেষায়িত এই পোশাক তৈরির কাজ তাই মূলত স্থানীয় শ্রমিকদের দক্ষতার ওপরই নির্ভরশীল।
সেই দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউবিএফ ব্রাইডালের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. রবিউল হক সিদ্দিকীর ভাষায়, কর্মীদের ছয় মাসের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নকশা ও দক্ষতা উন্নয়নে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিনিয়োগও বাড়ছে। আদমজী ইপিজেডের জুলাই ২০২৬ সালের কোম্পানি প্রোফাইল অনুযায়ী, জার্মান মালিকানাধীন ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেডে প্রকৃত বিনিয়োগ ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮৭ ডলার।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে মূলত শার্ট, টি-শার্ট, ট্রাউজার বা সোয়েটারের মতো পণ্যের জন্য পরিচিত। এখন সেই পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিয়ের গাউন ও অন্যান্য বিশেষায়িত পোশাক। ইউরোপ-আমেরিকার কোনো নববধূ যখন তার জীবনের বিশেষ দিনে বাংলাদেশে তৈরি একটি গাউন পরছেন, তখন সেই পোশাকের প্রতিটি সূক্ষ্ম কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকছে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকের হাত।
আদমজীর এই কারখানা তাই শুধু পোশাক রপ্তানির আরেকটি ঠিকানা নয়। বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে বাংলাদেশের সক্ষমতারও একটি উদাহরণ এটি। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, স্থানীয় শ্রমিকের দক্ষতা এবং নতুন বিনিয়োগ— এই তিনের সমন্বয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাতে খুলতে পারে আরও নতুন দরজা।




