ইরানের নিশানায় জর্ডানের আল-আজরাক, ঘাঁটিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আইআরজিসির দাবি করা, ৩০ আগস্টে হামলা চালানো জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটি। ছবি : রয়টার্স
ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে যুদ্ধ শুরু করেছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন তার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন হামলার জবাবে আরব মিত্র দেশগুলোর সামরিক স্থাপনা বারবার ইরানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যারমধ্যে, জর্ডানে থাকা আল-আজরাক মার্কিন ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
সবশেষ মঙ্গলবার ইরান জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি তারা আকাশেই ধ্বংস করেছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়েছে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অবশ্য বলেছে, হামলায় মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধবিমান রাখার স্থান, রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্র ও প্রস্তুতি এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যদিও এ দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমগুলো।
তাহলে এখন প্রশ্ন, জর্দানের আল-আজরাক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঘাঁটিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
আল-আজরাক জর্ডানের রাজধানী আম্মানের প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। এটি দেশটির পূর্ব মরুভূমি এলাকায় অবস্থিত।
এই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা ও যুদ্ধবিমান রয়েছে। এখানে এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমান রাখার ব্যবস্থা আছে বলে ইরান দাবি করেছে।
ঘাঁটিতে বড় রানওয়ে ও বিমান রাখার জায়গাও রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি শুধু একটি বিমানঘাঁটি নয়। এটি বড় ধরনের সামরিক সহায়তা ও রসদকেন্দ্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জর্ডানের সামরিক সম্পর্কও অনেক পুরোনো। ২০২১ সালের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী জর্ডানের ১২টি সামরিক স্থাপনায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে।
জর্ডানে প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা বিভাগের তথ্য। তাদের একটি অংশ আল-আজরাকে অবস্থান করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর অবস্থান।
জর্ডান ইরান থেকে অনেক দূরে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের অনেক কাছাকাছি। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম রেখে যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে অভিযান চালাতে পারে।
এ কারণেই আল-আজরাক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই কারণে এটি ইরানের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
ইরান কেন এখন জর্ডানকে লক্ষ্য করছে
এর পেছনে সরাসরি প্রতিশোধের হিসাব আছে।
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে। এর আগে ইরানের বাহিনী দুই দফায় মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করেছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে।
ওয়াশিংটনের ওই হামলার জবাব দিতে গিয়ে ইরান এবার শুধু সমুদ্রপথে আঘাত করছে না। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্য করছে।
এরই অংশ হিসেবে জর্ডানের আল-আজরাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। একই সময়ে হুতিরাও সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। ফলে যুদ্ধের পরিধি দ্রুত বাড়ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইরান ও পারস্য উপসাগর। এখন সেই সংঘাত জর্ডান, সৌদি আরব এবং সমুদ্রপথেও ছড়িয়ে পড়ছে।
আল-আজরাক নতুন লক্ষ্য নয়
এবারই প্রথম আল-আজরাকে লক্ষ্য করেনি ইরান।
এর আগে কয়েক দফা এই ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে তেহরান। জুলাইতেও ইরান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি করেছিল। তখন যোগাযোগব্যবস্থা, রাডার ও জ্বালানি সংরক্ষণকেন্দ্র লক্ষ্য করার কথা বলা হয়েছিল।
এর আগে আরও বড় হামলার ঘটনাও ঘটেছে। জুলাইয়ে আল-আজরাকে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছিলেন।
অর্থাৎ এবারকার হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
ইরান ধীরে ধীরে দেখিয়ে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিও নিরাপদ থাকবে না।
জর্ডানের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ কোথায়
জর্ডান এই যুদ্ধে সরাসরি পক্ষ হতে চায় না। কিন্তু তার ভৌগোলিক অবস্থান তাকে যুদ্ধের বাইরে থাকতে দিচ্ছে না।
একদিকে ইসরায়েল। অন্যদিকে ইরাক ও সিরিয়া। দক্ষিণে সৌদি আরব। আর পূর্ব দিকে ইরানের দিকে বিস্তৃত অঞ্চল।
জর্ডান নিজে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আবার ইসরায়েলের সঙ্গেও তার শান্তিচুক্তি রয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কারণে ইরানের চোখে জর্ডান এখন যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এখানেই ঝুঁকি। যদি ইরানের হামলা আরও বাড়ে, জর্ডানকে আরও সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধে নামতে হতে পারে। তখন ইরান ও জর্ডানের সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে।
এমন পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
হরমুজের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতেও সংঘাত চলছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করছে। যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার পর ইরানও একাধিক জাহাজে হামলার দাবি করেছে। এতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই তেলপথ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরমুজে সংকটের সঙ্গে জর্ডানের আল-আজরাকের সরাসরি ভৌগোলিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু সামরিক সম্পর্ক আছে।
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে লড়ছে। অন্যদিকে স্থলভাগে থাকা ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করছে। ইরান সেই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করছে।
অর্থাৎ যুদ্ধ এখন একই সঙ্গে সমুদ্র, আকাশ ও স্থল—তিন জায়গাতেই ছড়াচ্ছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা
এই সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর বিস্তার।
ইরান যদি শুধু মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, যুক্তরাষ্ট্র তার জবাব দেবে। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা করলে ইরান আরও আঘাত করতে পারে।
এর মধ্যে সৌদি আরবে হুতিদের হামলা শুরু হয়েছে। হরমুজে জাহাজ চলাচলও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
ফলে একটি হামলা আরেকটি হামানের পথ তৈরি করছে।
জর্ডানও এখন সেই চক্রের মধ্যে ঢুকে গেছে।
আল-আজরাকে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। জর্ডান ১৮টি ঠেকিয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাটাই দেখিয়ে দিচ্ছে, ইরান কতটা বড় হামলা চালাতে প্রস্তুত।
আজকের হামলায় কেউ নিহত হয়নি। কিন্তু পরের হামলাতেও একই ফল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আর যদি কোনো হামলায় মার্কিন সেনা বা জর্ডানের বেসামরিক মানুষ বড় সংখ্যায় হতাহত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও দ্রুত বদলে যেতে পারে।
সেখানেই আল-আজরাকের আসল গুরুত্ব।
এটি এখন শুধু জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটি নয়। এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রের একটি নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
আর যুদ্ধ যত বেশি দেশ ও সামরিক ঘাঁটিকে টেনে নেবে, ততই একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়বে।
সূত্র : আলজাজিরা





