অন্যের হাসিতেই খুশি মোরশেদুল

অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন মোরশেদুল
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মোরশেদুল ইসলাম (৪০) মানবিক তাড়নায় ছুটে চলেন অসহায় মানুষের পেছনে। এলাকার মানুষের সংকটে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। তীব্র শীতে দরিদ্র মানুষের ঘরে গরম কাপড় ও কম্বল পৌঁছে দেন। বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া থেকে মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করা— সবখানেই তার উপস্থিতি লক্ষ করার মতো।
শুধু তা-ই নয়, অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ হতে চলা মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা এবং অর্থের জোগান দেন দরিদ্রদের চিকিৎসায়।
উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানসিংহপুর অফিসপাড়া গ্রামের আব্দুল আজিজ মণ্ডলের ছেলে মোরশেদুল ২০১৪ সাল থেকে করে আসছেন বিভিন্ন মানবিক কাজ। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বদরগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তার পাশে রোপণ করেছেন ১২ হাজারের বেশি তালবীজ। সেসব বীজ থেকে বেশিরভাগ গাছই এখন বেড়ে উঠছে।
মোরশেদুল জানালেন, অসহায় ব্যক্তিদের নিয়ে ভিডিও করে তার ফেসবুক পেজে দেন। তা দেখে অনেকে অর্থসহায়তা দেন। সেই অর্থে তিনি এ পর্যন্ত ৫৫টি হুইলচেয়ার, ৫০টি ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ৪টি অটোরিকশা, ১২০টি সেলাই মেশিন বিতরণ করেছেন। বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ফ্যান বিতরণ করেছেন ১২০টি। ২৫টি পরিবারকে ঘর, আটজনকে পুঁজিসহ মুদি দোকান নির্মাণ করে দিয়েছেন। সবজি ও শুঁটকি ব্যবসার জন্য পুঁজি দিয়েছেন পাঁচজনকে। বিভিন্ন মসজিদ ও রাস্তার পাশে ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন। পরিবার পর্যায়ে ২০টি নলকূপ স্থাপন করে দিয়েছেন। এ ছাড়া অভাবী পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে বিতরণ করেছেন পাঁচটি গরু ও ১০টি ছাগল। রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ৩৫টি ক্যাম্প পরিচালনা করেছেন। উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ শিক্ষার্থীকে দিয়েছেন বৃত্তি।
তার এমন নিঃস্বার্থ মানবিক কাজের বিষয়ে স্থানীয় প্রবীণ রেজাউল করিম বললেন, ‘মোরশেদুল ইসলাম আমাদের এলাকার গর্ব। বিপদে-আপদে তাকে ফোন দিলেই ছুটে আসেন।’ রাধানগর ইউনিয়নের মানসিংহপুরের অসহায় মানিকুল ইসলামকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান কিনে দেন মোরশেদুল। সেই ভ্যানের আয় থেকে তিনি কয়েকটি গরু-ছাগল কিনে পালন করছেন। বসবাসের জন্য টিনের দুটি ঘর করেছেন। মানিকুলের ভাষ্য, ‘আমি এখন খুব সুখে আছি। মোরশেদুল ভাই আমার যে উপকার করেছেন, তা কোনোদিন ভুলব না।’
মোরশেদুল একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করেন। তার ভাষ্য, চাকরির বেতন ও পৈতৃক জমি চাষাবাদের আয়ে স্ত্রী, দুই সন্তান, মা-বাবাকে নিয়ে তার পরিবার মোটামুটি ভালোই চলে। এ পর্যন্ত ৩৯ বার রক্ত দিয়েছেন।
মোরশেদুলের স্ত্রী রোজিনা খাতুন বললেন, ‘তার মানবিক কাজগুলো দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। কারও দুঃখ-দুর্দশা দেখে স্থির থাকতে পারে না সে।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মুশফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মোরশেদুলের মানবিক কাজগুলোর মাধ্যমে এলাকার অনেক অসহায় দরিদ্র মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। তিনি এখন অনেক অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছেন।’
‘মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব। কারও মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারলে বা বিপদে একটু উপকারে করতে পারলে যে মানসিক তৃপ্তি পাই, তা টাকার বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব নয়। যতদিন বেঁচে আছি, এভাবে মানুষের সেবা করে যেতে চাই’— বলছিলেন মোরশেদুল।





