বিসিবির চোখে হরেদরে সবাই সমান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০০৮ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক এনামুল হকের, সবশেষ ম্যাচটি খেলেছেন গত এপ্রিলে। ক্যারিয়ারে ১৩৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, সেখান থেকে ৮টি টেস্ট বাদ দিলে বাকি ১৩০টি ম্যাচই এই ডানহাতি ব্যাটার খেলেছেন জাতীয় ক্রিকেট লিগ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে। আসন্ন মৌসুমে তার ম্যাচ ফি হবে ১.৫ লাখ টাকা আবার একদম নতুন যে ক্রিকেটারের অভিষেক হবে, তার জন্যও সমান অর্থ। এটা কি বৈষম্য ঘোচানো নাকি মুড়িমুড়কি এক করে ফেলার চেষ্টা?
তামিম ইকবাল দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের ভেতর প্রথম শ্রেণির ম্যাচের ৭০ হাজার টাকা ম্যাচ ফি বেড়ে হয়ে গেছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এমনকি শ্রীলঙ্কায়ও এভাবে ঢালাও ম্যাচ ফি বাড়ানোর সংস্কৃতি নেই।
ক্রিকেটের যেকোনো উদাহরণ এলেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা আগে আসে। ভারতের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতা রঞ্জি ট্রফিতে ৪১-৬০ বা তার বেশি ম্যাচ যারা খেলেছেন, তাদের ম্যাচ ফি দৈনিক ৬০ হাজার, যাদের ক্যারিয়ারে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ সংখ্যা ২১-৪০, তাদের ম্যাচ ফি ৫০ হাজার আর ০-২০ ম্যাচ খেলা ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি ২৫ হাজার রুপি। রিজার্ভ ক্রিকেটাররা আনুপাতিক হারে নিজস্ব ক্যাটাগরির ম্যাচ ফির অর্ধেক পাবেন আর দলের সঙ্গে খেলোয়াড় ছাড়া অন্য ভূমিকায় থাকারা পাবেন দৈনিক ২৫ হাজার রুপি হারে।
ইংল্যান্ডের ক্রিকেট প্রশাসন সংস্থা ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড একটা নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। রুকি কন্ট্রাক্ট বা নবীন খেলোয়াড়দের চুক্তিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বছরে সর্বনিম্ন ২০ হাজার পাউন্ড একজন ক্রিকেটারকে (নারী-পুরুষ) দিতেই হবে কাউন্টি দলকে। এরপর ধাপে ধাপে একজন ক্রিকেটার ‘সিনিয়র প্রো’ পর্যায়ে উন্নীত হলে তার সঙ্গে চুক্তির মূল্যও বাড়বে। অর্থটা ১২ মাসে সমান ভাগ করে একজন ক্রিকেটারকে দেওয়া হয়, যাতে খেলার মৌসুমের বাইরের সময়টাও তার প্রস্তুতি থেকে না যায়। প্রতি বছর ইসিবি প্রথম শ্রেণির কাউন্টি ক্রিকেটে (নারী-পুরুষ) ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করে। এর বড় একটি অংশ (৭০ মিলিয়ন পাউন্ড) কাউন্টি পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় সরাসরি অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়, যা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা কাউন্টিগুলোকে তাদের পরিচালনা খরচ চালাতে সাহায্য করে।
এই সরাসরি অনুদানের পাশাপাশি ইসিবি তাদের ‘ইনস্পায়ারিং জেনারেশনস’ কৌশলের অংশ হিসেবে নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা পূরণে সাহায্য করার জন্য প্রথম শ্রেণির কাউন্টিগুলোকে প্রতি বছর প্রায় ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থায়ন করে। এর মধ্যে রয়েছে কাউন্টিগুলোর সুযোগ-সুবিধার সংস্কার, নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনার পথ সুগম করা, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরি করা এবং নারীদের ঘরোয়া লীগ পরিচালনায় সহায়তার বিনিয়োগ।
শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ ফি পান দিন ভিত্তিতে। শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাবভিত্তিক তিন দিনের ম্যাচ বা জাতীয় পর্যায়ের চার দিনের ম্যাচের প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটাররা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাভেদে দিনে সাড়ে ৭ হাজার শ্রীলঙ্কান রুপি থেকে দৈনিক ১৫ হাজার রুপি পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। এর ফলে ম্যাচভেদে এবং খেলোয়াড়ের মান অনুযায়ী একজন ২৫ থেকে ৬০ হাজার রুপি পেয়ে থাকেন।
এই মুহূর্তে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে সবচেয়ে নিচের দল পাকিস্তান, তাদের বাংলাদেশ ঘরের মাঠে এবং তাদের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করেছে। ইংল্যান্ড সফরে থাকা পাকিস্তান দলে ব্যাপক অদলবদল তাদের বানিয়েছে হাসির খোরাক। তবে রাজনীতির মাঠের পাকা খেলোয়াড় মহসিন নাকভি দেশের খেলোয়াড়দের বেতন বাড়িয়ে সবকিছু আড়াল করছেন। জুনের ৩০ তারিখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য কায়েদে আজম ট্রফি অর্থাৎ পাকিস্তানের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্টের জন্য ম্যাচ ফি ঘোষণা করা হয়েছে ১ লাখ রুপি, যা আগে ছিল ৩০ হাজার রুপি। ২০২৪-২৫ মৌসুমেও পিসিবি (পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড) ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচে ২ লাখ রুপি ম্যাচ ফির ঘোষণা দিলেও দিয়েছিল স্রেফ ৩০ হাজার করে। এ ছাড়া রিজার্ভে থাকা খেলোয়াড়দের একাদশে থাকা খেলোয়াড়দের তুলনায় ম্যাচ ফির অর্ধেক দেওয়া হবে।
বেশ কয়েক মৌসুম সিলেট বিভাগীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন আলী ওয়াসিকুজ্জামান চৌধুরী অনি। তার আশঙ্কা, ‘অযোগ্য খেলোয়াড়কে খেলিয়ে দেওয়ার ভয় থাকতে পারে। এখন মুশফিকুর রহিম, যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টেস্ট ম্যাচ খেলা ক্রিকেটার; সে জাতীয় লিগে খেলল আর একটা নতুন খেলোয়াড়ও খেলল, দুজনেরই ম্যাচ ফি যদি সমান হয়, তাহলে তো একটা সুযোগ তৈরি হয়। কোনো দলে অযোগ্য খেলোয়াড়দের খেলিয়ে দিয়ে যদি কর্মকর্তারা ম্যাচ ফির অঙ্কে ভাগ বসান, এটা মোটেই অবাস্তব হবে না, বিশেষ করে বাংলাদেশে। কারণ, টাকা-পয়সা তো সবারই দরকার।’





